নিজস্ব প্রতিবেদক
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের বিষয়ে তাদের অবস্থান ও ব্যাখ্যা স্পষ্ট করেছে। রাজধানীতে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভার্স আইজাবস বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা যেখানে সমাজের সব স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, ভোটার উপস্থিতি হবে বিশ্বাসযোগ্য এবং পুরো ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হবে। তিনি বলেন, এই তিনটি বিষয়—অন্তর্ভুক্তি, অংশগ্রহণ এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ—ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশনের কাজের কেন্দ্রবিন্দু।
অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন বলতে ইইউ কী বোঝে—এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আইজাবস বলেন, তাদের দৃষ্টিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক মানে হচ্ছে বাংলাদেশের সব সামাজিক গোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এর মধ্যে নারী, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আঞ্চলিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন তখনই প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, যখন সমাজের প্রতিটি অংশ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায় এবং নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে নিরাপদ বোধ করে। এ ধরনের অন্তর্ভুক্তি নাগরিকদের সামগ্রিক অংশগ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং ভোট ন্যায্য ও স্বচ্ছভাবে গণনা হওয়ার ওপর আস্থা তৈরি করে।
এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান পর্যবেক্ষক জানান, ‘অংশগ্রহণমূলক’ শব্দটির মাধ্যমে তারা মূলত বিশ্বাসযোগ্য ভোটার উপস্থিতিকে বোঝাচ্ছেন। তার মতে, উচ্চ ও বিশ্বাসযোগ্য ভোটার উপস্থিতি এই ইঙ্গিত বহন করে যে নাগরিকরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখছেন এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হচ্ছেন। তিনি বলেন, ভোটার উপস্থিতি কেবল সংখ্যার বিষয় নয়; বরং এটি রাজনৈতিক পরিবেশ, নাগরিক স্বাধীনতা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতার প্রতিফলন। এ ক্ষেত্রে ভোটারদের ভয়ভীতি, চাপ বা প্রভাবমুক্ত পরিবেশে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্ভাব্য ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতার ঝুঁকি প্রসঙ্গে আইজাবস বলেন, এটি ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নজরদারি ক্ষেত্র। তিনি জানান, মিশনটি দেশের ৬৪টি জেলায় পর্যবেক্ষক মোতায়েন করবে এবং তাদের বিশেষভাবে সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর নিরাপত্তা, ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ এবং সম্ভাব্য হয়রানি বা সহিংসতার বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে। নির্বাচনের আগে বা পরে সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে তিনি বলেন, স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশিরা নির্বাচনের গুরুত্ব উপলব্ধি করছে এবং সব অংশীজনই সহিংসতামুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।
প্রধান পর্যবেক্ষক আরও জানান, এই পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন বাংলাদেশের সরকারের আমন্ত্রণে কাজ করছে এবং ২০০৮ সালের পর এটি ইইউর প্রথম পূর্ণাঙ্গ মিশন। লাটভিয়ার ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য ইভার্স আইজাবসের নেতৃত্বে মিশনটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে কার্যক্রম শুরু করে এবং বর্তমানে ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষকসহ দেশের ৬৪টি জেলায় বিস্তৃত হচ্ছে। পূর্ণ সক্ষমতার এই মিশনে ইইউর ২৭টি সদস্য দেশের পাশাপাশি কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষক যুক্ত থাকবেন।
তিনি বলেন, মিশনটি নির্বাচন প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগ, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে নির্বাচন প্রস্তুতি, আইনগত কাঠামো, প্রচারণা, নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তি এবং গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা মূল্যায়ন করবে। এই পর্যবেক্ষণ স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও হস্তক্ষেপহীনতার নীতিতে পরিচালিত হবে এবং ভোটের দুই দিন পর, ১৪ ফেব্রুয়ারি একটি প্রাথমিক বিবৃতি প্রকাশ করা হবে। প্রায় দুই মাস পর প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য সুপারিশ থাকবে বলে জানান তিনি।

01612346119