নিজস্ব প্রতিবেদক
সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও তার বান্ধবী তৌফিকা করিমসহ চারজনের বিরুদ্ধে প্রায় ২৫ কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে মানিলন্ডারিং মামলা দায়ের করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট এ মামলাটি দায়ের করে। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রোববার এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে এই মামলাটি দায়ের করা হয়েছে এবং বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
সিআইডির অনুসন্ধানে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বান্ধবী তৌফিকা করিম, মো. রাশেদুল কাওসার ভুঞা জীবন এবং মো. কামরুজ্জামান পরস্পর যোগসাজশে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র গঠন করেন। এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চাঁদাবাজির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ আদায় করে আসছিল। সিআইডির দাবি অনুযায়ী, চক্রটির কর্মকাণ্ড ছিল সুসংগঠিত ও ধারাবাহিক, যা মানিলন্ডারিংয়ের একটি সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, চক্রটি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের গুলশান শাখাকে কেন্দ্র করে নিয়মিতভাবে চাঁদাবাজি কার্যক্রম পরিচালনা করত। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযুক্ত মো. কামরুজ্জামান ২০১৫ সালে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে যোগদান করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি তৌফিকা করিমের মালিকানাধীন ‘সিরাজুল হক অ্যাসোসিয়েটস’ নামের একটি ল’ ফার্মের সঙ্গে নামমাত্র আইনি পরামর্শ চুক্তি করেন। এই চুক্তির আড়ালে নিয়মিতভাবে তৌফিকা করিমের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর করা হতো। সিআইডির তথ্যমতে, ওই ব্যাংকের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রতি মাসে গড়ে ১০ লাখ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হতো।
সিআইডি জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পলাতক হওয়ার আগ পর্যন্ত শুধু ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান থেকেই এই চক্রটি মোট ১০ কোটি ৮০ লাখ টাকা আদায় করেছে। পাশাপাশি অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, তৌফিকা করিমের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ১০ কোটি ৬০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়েছে। এছাড়া সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক মন্ত্রী হওয়ার পর তৌফিকা করিম ও মো. রাশেদুল কাওসার ভুঞা জীবনকে তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) হিসেবে নিয়োগ দেন। একই সময়ে তিনি ‘লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স টু হেল্পলেস প্রিজনার অ্যান্ড পারসন্স’ নামে একটি এনজিও গঠন করেন, যেখানে তৌফিকা করিম চেয়ারম্যান, মো. রাশেদুল কাওসার ভুঞা জীবন সেক্রেটারি জেনারেল এবং আনিসুল হক নিজে ট্রেজারার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সিআইডির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওই এনজিওর নামে সোনালী ব্যাংক পিএলসি, সুপ্রিম কোর্ট শাখায় পরিচালিত ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিতভাবে চাঁদার অর্থ আদায় করা হতো। ২০১৫ সালের ১১ মার্চ থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এই এনজিওর মাধ্যমে সর্বমোট ২৪ কোটি ৫৩ লাখ ৬৯ হাজার ২১ টাকা চাঁদা আদায়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধিত ২০১৫) এর ৪(২) ধারায় নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সঙ্গে মহানগর স্পেশাল জজ আদালত, ঢাকার আদেশে তৌফিকা করিমের নিজ নামে বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা ২৬টি হিসাব নম্বরে জমাকৃত মোট ২৪ কোটি ৫৩ লাখ ৬৯ হাজার ২১ টাকা ফ্রিজ করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট পরিচালনা করছে এবং অপরাধের পূর্ণাঙ্গ তথ্য উদঘাটন, অজ্ঞাত সদস্যদের শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

01612346119