নিজস্ব প্রতিবেদক
ভোটের আগে অবৈধ অর্থের ব্যবহার ও ভোটার প্রভাবিত করার আশঙ্কা থেকে মোবাইল ও ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন কড়াকড়ির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে আগামী ৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি—এই ছয় দিন দেশের সব মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং কার্যক্রমে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সূত্র জানায়, এই সময়ে বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়সহ সব মোবাইল ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্মে দিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পাঠানো যাবে। একই সঙ্গে প্রতিটি লেনদেনের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ১ হাজার টাকা। ফলে এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন কার্যত বন্ধ থাকছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে করে নির্বাচনের আগে সংগঠিতভাবে ভোটারদের মধ্যে অর্থ বিতরণের সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে।
একই সময়ে আরও কঠোর হচ্ছে ইন্টারনেট ব্যাংকিং চ্যানেল। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি (P2P) টাকা পাঠানোর সুবিধা সাময়িকভাবে পুরোপুরি বন্ধ রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংকের ‘আস্থা’, সিটি ব্যাংকের ‘সিটিটাচ’, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ‘নেক্সাস পে’সহ প্রায় সব ব্যাংকিং অ্যাপে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে পারে। অর্থাৎ অ্যাপ ব্যবহার করে তাৎক্ষণিকভাবে অন্যের হিসাবে টাকা পাঠানো যাবে না, যা নির্বাচনের আগে ডিজিটাল লেনদেনকে উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউ সূত্রের দাবি, নির্বাচন কমিশন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে ভোটের আগে ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে কালো টাকা ছড়ানো, ভোট কেনা বা প্রভাব বিস্তারের ঘটনা ঘটতে পারে। সেই ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েই এই বিশেষ ব্যবস্থা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এটি কোনো স্থায়ী সিদ্ধান্ত নয়; বরং একটি নির্বাচনকালীন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা।
এর পাশাপাশি নগদ টাকা উত্তোলন ও জমার ওপরও বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে এক দিনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি লেনদেন হলে তা বাধ্যতামূলকভাবে বিএফআইইউকে রিপোর্ট করতে হবে। এই রিপোর্টে কোনো ধরনের অসঙ্গতি বা সন্দেহজনক তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যাংককেও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। প্রয়োজনে ব্যাংকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বা আর্থিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের বরাতে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী খুব শিগগিরই এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় লেনদেনের সীমা আরও কমানো বা কিছু ক্ষেত্রে শিথিল করার ক্ষমতাও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংরক্ষণ করছে। অর্থাৎ মাঠের বাস্তবতা ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন নির্বাচনকে স্বচ্ছ রাখতে সহায়ক হবে, অন্যদিকে সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়িক লেনদেনে সাময়িক ভোগান্তি তৈরি করতে পারে। তবে নির্বাচন একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়ায় অধিকাংশ মানুষই এই সাময়িক অসুবিধা মেনে নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ভোটের আগে অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগকে নির্বাচনকালীন আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষার একটি কঠোর কিন্তু সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119