
নিজস্ব প্রতিবেদক
হাওরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত উন্নয়ন এবং পিছিয়ে থাকা জনপদে আধুনিক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলতে নেওয়া বড় বাজেটের একটি সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের মাঝপথে এসে গতি হারিয়েছে। প্রায় ৯৪৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে পরিচালিত ‘হাওর এলাকার নির্বাচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্পটি এখন কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পরিকল্পনা কমিশনের পরিবীক্ষণ সূত্র বলছে, নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত প্রকল্পটির অগ্রগতি সন্তোষজনক থাকলেও এরপর মাঠপর্যায়ে কাজের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বর্তমানে প্রায় ৬৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হলেও বাকি অংশ শেষ করার বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনিক দুর্বলতা, মাঠপর্যায়ে সমন্বয়হীনতা, তদারকির অভাব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব—এসব কারণেই প্রকল্পটি ধীরগতির শিকার হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্প পরিচালক পদ শূন্য থাকায় বড় পরিসরের এই উন্নয়ন কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পটি অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করা যায়নি বলেও স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পের আওতায় নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ জেলার ১৬টি উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও আধুনিক শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার কথা ছিল।
বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রকল্পের একাধিক স্থানে নির্মাণকাজ থমকে আছে বা নিম্নমানের কাজ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ সরকারি কলেজে নির্মাণাধীন ছয়তলা ভবনের কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ভবনে লিফট স্থাপন না হওয়ায় সেটি এখনো ব্যবহার উপযোগী হয়নি। অন্যদিকে, সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার বাদশাগঞ্জ পাবলিক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নির্মিত ছাত্রীনিবাসে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। দরজার কাঠ নির্ধারিত মানের তুলনায় কম পুরু হওয়ায় নির্মাণমান নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
প্রকল্প ব্যয়ের বড় অংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে আবাসন অবকাঠামোর জন্য। এর মধ্যে—
এছাড়া—
তবে নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত মোট ব্যয় হয়েছে মাত্র ৩৮২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, যা প্রকল্প অগ্রগতির তুলনায় পিছিয়ে থাকার ইঙ্গিত দেয়।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঠিকাদারদের বিল পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। সময়মতো অর্থ ছাড় না হওয়ায় অনেক ঠিকাদার কাজ ধীর করে দিয়েছেন বা বন্ধ রেখেছেন।
হাওর অঞ্চলের স্বাভাবিক ভৌগোলিক বাস্তবতাও প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসব কারণে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং করোনা-পরবর্তী শ্রমিক সংকট।
প্রকল্পটির মেয়াদ প্রথমে ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও পরে তা বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে সময় বাড়ানো হলেও অতিরিক্ত কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। কর্তৃপক্ষের দাবি, বিদ্যমান বাজেটের মধ্যেই অবশিষ্ট কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে নির্মাণকাজ, সরঞ্জাম ক্রয় এবং বিল পরিশোধে নিয়ম না মানার অভিযোগও উঠে এসেছে। বিশেষ করে বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ব্র্যান্ড অ্যান্ড রি-ব্র্যান্ড’-কে নির্ধারিত শর্ত পূরণ ছাড়াই প্রায় দুই কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযোগগুলোর ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হলে—
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, হাওরাঞ্চলের মতো পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে শিক্ষার মানোন্নয়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। জাতীয় গড় দিয়ে উন্নয়ন বিচার করলে হবে না, অনগ্রসর এলাকাগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। তার মতে, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনও জরুরি। যেমন—
সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রয়োজনীয় সংস্কার, কার্যকর তদারকি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনের মধ্যেই শেষ করা সম্ভব হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন সুবিধা বাড়বে, ঝরে পড়া কমবে, শিক্ষার পরিবেশ উন্নত হবে এবং পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ কে এম মাহফুজুর রহমান
প্রধান সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
যোগাযোগ: ১৯৮ সি-ব্লক, রায়েরবাগ, কদমতলী, ঢাকা- ১৩৬২।
মোবাইল: ০১৬১২৩৪৬১১৯,ইমেইল: dhaka24news.top@gmail.com
ওয়েবসাইট: dhaka24news.top, ফেসবুক: https://www.facebook.com/DHAKA24NEWS.TOP/