
আহমাদ আব্দুল কাহ্হার
------------- পর্ব ১ -------------
আসলে দুআ মানে শুধু হাত তুলেই কিছু দুআ-দুরুদ পাঠ নয়, বা মনের হাজত ব্যক্ত করা নয়—বরং দুআ হল নিজেকে পুরোপুরি অসহায়, একেবারে ভিক্ষুকের মতো উপস্থাপন করে, সকল ক্ষমতার মালিক আল্লাহ তাআলার কাছে নিজের হাজতগুলো পূরণের আকুতি জানানো।
উদাহরণ স্বরূপ—একজন ভিক্ষুক যত বেশি করুণার আবহে নিজেকে পেশ করতে পারে, সে তত বেশি মানুষের করুণার চোখে পড়ে। আপনাকে প্রথমেই নিজের দিকে তাকিয়ে দেখতে হবে—আপনি কি সত্যিই আল্লাহর সামনে নিজেকে সেভাবে উপস্থাপন করতে প্রস্তুত হয়েছেন?
দেখুন, একজন সামর্থবান ব্যক্তির কাছে কোনো ভিক্ষুক গিয়ে কখনো এভাবে বলেনা—“এই ভাই! কই আমার টাকা? দিন টাকা!”—এটা তো চাঁদাবাজির ভাষা! ভিত্তবান লোক কেন তাকে দেবে? অর্থের মালিক তো তিনি নিজেই—কাকে দেবেন, সেটা তার সিদ্ধান্ত। সেখানে আরেকজন ভাগ বসানোর কে?
সুতরাং অসহায় ব্যক্তি কীভাবে চায়?
“স্যার! অনেক কষ্টে আছি… কিছু টাকা দিন না স্যার! …”
এই যে কোমল ভাষায় ওজর পেশ করা বা নিজেকে তুচ্ছ করে উপস্থাপন করে ফেলা—কেন?
কারণ এভাবে না চাইলে কেউ তাকে ইহসান করবে না।
এখন আপনি বলুন—এই পৃথিবীর কোন জিনিস আপনার নিজের?
কিছুই নয়!
বরং সবই আল্লাহর অনুগ্রহে, এবং সব কিছুর প্রকৃত মালিক তিনি মহান রব।
তিনি যদি কাউকে দান না করেন—পৃথিবীর কেউ তাকে আপনাকে দান করতে পারবে না। তিনি দান করে ভোগের সুযোগ দেন। নতুবা বহু মানুষ আছে—কামাই করেও ভোগের আগেই মৃত্যু এসে গেছে, বা সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে। এর মানে কী?
আল্লাহ তাকে ভোগের সুযোগ দেননি।
এটি কী বুঝায়?
প্রকৃত সম্পদের মালিক তিনি এবং সেটি ভোগের সুযোগ দাতা ও —একমাত্র আল্লাহ!
সুতরাং, আপনাকে প্রকৃত মালিক থেকে কিছু পেতে হলে—নিজেকে ভিক্ষুক বানাতেই হবে…
এই “ভিক্ষুক সাজা” মানে কী?
টুপি, তাসবীহ, জায়নামাজ নিয়ে বসে যাওয়া?
মোটেও না।
একটু ভেবে দেখুন—আপনি জানেন, এলাকার কোনো ব্যক্তি নানা অপরাধে জড়িত—মিথ্যা বলে, চুরি করে… অথচ ভিক্ষা করতে এলে বড় দরবেশ সাজে—দাঁড়ি, টুপি, জুব্বা পরে। বলুন তো—এলাকার কত মানুষ তাকে ভিক্ষা দেবে?
খুবই কম।
কেন?
কারণ অপরাধীর প্রতি মানুষের করুণা কমে যায়।
এই কারণেই, যে ব্যক্তি যে এলাকায় ভিক্ষা করে—সে সেখানে ছোটখাটো অপরাধ থেকেও নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে। কারণ, মানুষ জেনে গেলে—কেউ তাকে কিছু দেবে না।
তাহলে ভাবুন—
ঐ মহান রব…
যিনি শক্ত পাথরের গভীরে থাকা ক্ষুদ্র প্রাণীর খবরও জানেন… যেমন তিনি বলেন
আয়াতের আরবি উচ্চারন
وَمَا مِن دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا ۚ كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ
অর্থ:
“পৃথিবীতে বিচরণশীল এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিক আল্লাহর দায়িত্বে নয়। তিনি জানেন তাদের অবস্থানস্থল ও সংরক্ষণস্থল—সবকিছুই সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।” (সূরা হূদ: ৬)
তাহলে বলুন—আপনি কী করছেন, কোথায় জড়িত—সবকিছুই তো তাঁর কাছে আয়নার মতো স্বচ্ছ!
আপনাকে অপরাধী জেনেও—তিনি রিজিক দিচ্ছেন, হতাশ করছেন না—
এটা কত বড় অনুগ্রহ, একবার কি ভেবেছেন?
তাহলে ন্যূনতম কমনসেন্স খাটান—
বড় বড় গুনাহে জড়িত থেকেও আপনি কীভাবে আশা করেন—
তিনি আপনার দুআ কবুল করে নিবেন?
আরেকটা বাস্তবতা—
গুনাহ করতে করতে আমাদের অন্তর মরিচিকার মতো শুকিয়ে যায়। তখন অনুশোচনা থাকে না। বাধ্য হয়ে কিছু দুআ-দুরুদ পড়ি, কিন্তু অন্তরে দাম্ভিকতা রয়ে যায়…
আর এই দাম্ভিকতা—
আমাদের আল্লাহ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়।
সুতরাং, আল্লাহর দরবারে ভিক্ষুক হতে হলে—
নিজের উপর গবেষণা চালাতে হবে!
আপনি কী কী গুনাহে জড়িত—তা খুঁজে বের করতে হবে,
এবং সেগুলো ছেড়ে দিতে হবে…
আর বেশি বেশি ইস্তেগফার করতে হবে।
কারণ—
একদিকে গুনাহ চালিয়ে যাওয়া, আরেকদিকে ক্ষমা চাওয়া—
এটা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়।
তাই আসুন—
নিজের ভেতর ঢুকে যাই…
ভুলগুলো খুঁজে বের করি…
চোখ ভিজিয়ে তওবা করি…
বিশেষ করে—
রাতের নির্জনে…
অথবা সফরের পথে…
নীরব কোনো মুহূর্তে…
নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—
“আমি কোথায় ভুল করছি?”
তারপর হিম্মত করে বলুন—
“আর করব না…”
মন উজাড় করে ক্ষমা চান…
তারপর দেখবেন—
হৃদয়ে কাঁপন ধরবে…
চোখে পানি চলে আসবে…
মনে হবে—
“আমি কত বড় অপরাধী… আর কেমন মহান বাদশাহর দরবারে দাঁড়িয়ে আছি…”
সেই মুহূর্তে—
আপনার দুআ হবে সত্যিকারের দুআ…
কারণ—
ওয়াল্লাহি!
মহান রব আমাদের সেই অসহায় কান্নাভেজা দুআ—ভীষণ পছন্দ করেন…
যেমন আমরা ভিক্ষা দিতে গিয়ে দেখি—
কে বেশি অসহায়ভাবে চাইছে…
ঠিক তেমনই—
আল্লাহও দেখেন—
কে কতটা ভেঙে পড়ে তাঁর কাছে চাইছে…
কিন্তু…
আপনি যদি গুনাহে ডুবে থাকেন—
তাহলে সেই ভাঙা হৃদয়, সেই কান্না—
কখনোই আসবে না…
ফলে দুআ থাকবে—
কিন্তু দুআর প্রাণ থাকবে না…
ইস্তেগফার
আয়াতের আরবি উচ্চারন
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ العَظِيمَ الَّذِي لَا إِلٰهَ إِلَّا هُوَ الحَيُّ القَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ، لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ العَلِيِّ العَظِيمِ
অর্থ
“আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি—যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক ও পালনকর্তা; এবং আমি তাঁর দিকেই ফিরে আসছি। কোনো ক্ষমতা নেই (গুনাহ থেকে বাঁচার), কোনো শক্তি নেই (ইবাদত করার)—আল্লাহ মহান ও সর্বোচ্চের সাহায্য ছাড়া।”
তাই আসুন—
ইস্তেগফার পড়ি…
হৃদয় ভেঙে পড়ি…
আর নতুন করে ফিরে আসি আল্লাহর দিকে..
(চলবে ইন শা আল্লাহ)
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ কে এম মাহফুজুর রহমান
প্রধান সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
যোগাযোগ: ১৯৮ সি-ব্লক, রায়েরবাগ, কদমতলী, ঢাকা- ১৩৬২।
মোবাইল: ০১৬১২৩৪৬১১৯,ইমেইল: dhaka24news.top@gmail.com
ওয়েবসাইট: dhaka24news.top, ফেসবুক: https://www.facebook.com/DHAKA24NEWS.TOP/