
বিশেষ প্রতিনিধি
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে ‘ভেরি ভেরি ইমপরট্যান্ট পারসন’ বা ভিভিআইপি মর্যাদার মেয়াদ ছয় মাস কমানো হয়েছে। সে হিসাবে আগামী ১০ আগস্টের পর তিনি আর এ মর্যাদা পাবেন না। এরপর থেকে তাকে বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিকের মতোই চলতে হবে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভিভিআইপি মর্যাদার মেয়াদ এক বছরের জায়গায় ছয় মাস করা হয়েছে। ফলে তিনি ১০ আগস্টের পর আর ভিভিআইপি নিরাপত্তা পাবেন না। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র কয়েক দিন আগে নিজেই নিজেকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে ঘোষণা দেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে ১০ ফেব্রুয়ারি এ সংক্রান্ত গেজেট জারি করা হয়।

এর ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই করা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা ও অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তা বিধিমালা ২০২৫ অনুযায়ী ড. ইউনূস দায়িত্ব ছাড়ার পর থেকে এসএসএফের নিরাপত্তাসুবিধা পাচ্ছেন। একজন ভিভিআইপি হিসেবে তার বাসভবন ও কর্মস্থলে দায়িত্বপালন করছেন এসএসএফ সদস্যরা। তার উপস্থিতিতে আয়োজিত সব অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা তল্লাশি থাকে এবং দেশ-বিদেশে ভ্রমণের সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের সমন্বয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে। নির্বাচিত নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণ করায় ওই দিনই ইউনূস সরকারের মেয়াদ শেষ হয়। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর প্রায় ১৮ মাস দায়িত্ব পালনের পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ছাড়েন।
ড. ইউনূসের দেড় বছরের শাসনামলে প্রভাবশালী বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে ‘গোলামি’ চুক্তি করাসহ পাহাড় সমান দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ক্ষমতায় এসেই তিনি নিজের বিরুদ্ধে হওয়া অনিয়ম ও দুর্নীতি সংক্রান্ত সব মামলা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করেন। ব্যক্তিগত ও গ্রামীণ নামের প্রতিষ্ঠানের হাজার কোটি টাকা কর মওকুফের ঘটনা ঘটেছে। অর্থনীতিবিদদের অভিযোগ, ড. ইউনূস ও তার সরকারের উপদেষ্টারা দেশের শিল্প, বাণিজ্য ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেউলিয়া করে দিয়েছেন। যত দিন যাচ্ছে ততই বেরিয়ে আসছে অন্তর্বর্তী সরকারের নানা দুর্নীতি-অপকর্মের তথ্য।ি ইতোমধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে ড. ইউনূসের দুর্নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে যার মধ্যে, ব্যক্তিগত মামলা খারিজ করা হয়েছে যেটি বিচার বিভাগীয় দুর্নীতি, ৬.৬৬ বিলিয়ন টাকা (প্রায় ৫৫ মিলিয়ন ডলার) কর মওকুফ যেটি আর্থিক দুর্নীতি, ৫ বছরের কর মওকুফ সুবিধা নিশ্চিতকরণ করা হয়েছে। এছাড়াও গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারের মালিকানা কমানো, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন, সরকারি সম্পদ রক্ষানীতি একচেটিয়া দখল, অর্থনৈতিক দুর্নীতি, গ্রামীণ ডিজিটাল ওয়ালেটের অনুমোদন, সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল থেকে ৭০০ কোটি টাকা সরানো, প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুগত লোক নিয়োগ করার মতো অভিযোগ তোলা হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সূত্র জানায়, দায়িত্ব হস্তান্তরের দু মাসের মাথায় হাম ও অন্যান্য রোগের শিশুদের টিকা ও সিরিঞ্জ ক্রয়ে অর্থ আত্মসাৎ, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে তদন্তপূর্বক সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ও সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ড. নূরজাহান বেগমসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাশ ও ব্যারিস্টার সানাউল্লাহ নূরে সাগর দুদক চেয়ারম্যান বরাবর এ আবেদন দাখিল করেন। আবেদনে সারা দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে প্রায় শতাধিক শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি রাষ্ট্রের একজন সচেতন নাগরিক ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে আমাকে মারাত্মকভাবে ব্যথিত, উদ্বিগ্ন এবং চিন্তিত করেছে। হামে আক্রান্ত হয়ে একের পর এক শিশুমৃত্যুর ঘটনায় সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ড. নূরজাহান বেগমের দায় রয়েছে বলে রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে মতামত ব্যক্ত করেছেন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানাগেছে, গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এক সরকারি গেজেটে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এর ফলে ক্ষমতা ছাড়ার পরও তিনি বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী বা এসএসএফ-এর কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ও ভিভিআইপি মর্যাদা ভোগ করবেন। বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী আইন, ২০২১-এর ধারা ২(ক) অনুযায়ী তাকে এই বিশেষ রাষ্ট্রীয় সম্মান ও সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছিল। তবে প্রধান উপদেষ্টাকে এই মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশে নতুন নয়, তবে এবারের সময়সীমা আগের চেয়ে কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে। এর আগে ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর এক গেজেটের মাধ্যমে তৎকালীন বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টাকে একই ধরনের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, তবে তা ছিল মাত্র তিন মাসের জন্য। নতুন প্রজ্ঞাপনে ড. ইউনূসের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা এক বছর নির্ধারণ করে একটি প্রশাসনিক নজির স্থাপন করা হয়েছে। প্রেসিডেন্টের আদেশক্রমে সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না স্বাক্ষরিত এই আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নতুন এই আদেশের ফলে ড. ইউনূস দায়িত্ব ছাড়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ স্তরের প্রটোকল ও নিরাপত্তা সুবিধা পাবেন।
এটি তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তার বিশেষ অবস্থানের প্রতি সরকারের শ্রদ্ধার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ২০০৬ সালের প্রজ্ঞাপনে নিরাপত্তা ও ভিভিআইপি সুবিধা শুধুমাত্র তিন মাসের জন্য কার্যকর থাকলেও এবার তা চার গুণ বাড়িয়ে এক বছর করা হয়েছে। ২০০২ সালের পুরনো প্রজ্ঞাপন বাতিল করে সে সময় যে নিয়ম করা হয়েছিল, ২০২৬ সালের এই নতুন গেজেট তাকে আরও সুসংহত করল। বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী আইন, ২০২১-এর আওতায় এই মর্যাদা দেওয়ার ফলে এসএসএফ এখন থেকে ড. ইউনূসের সার্বক্ষণিক সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করবে। উল্লেখ্য, শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিগত সরকারের সময়ে ১৬৮টি মামলা করা হয়েছিল। এরমধ্যে ফৌজদারি আদালতে একটি, দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি এবং বাকি ১৬৬টি মামলা ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে বিচারাধীন ছিল। শ্রম আদালতে বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে গ্রামীণ টেলিকম সংশ্লিষ্ট মামলা ৬৪টি। এছাড়া গ্রামীণ কল্যাণের ৬৯টি, গ্রামীণ কমিউনিকেশনের ২৫টি ও গ্রামীণ ফিশারিজের নামে ৮টি ছিল।
প্রধান সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
যোগাযোগ: ১৯৮ সি-ব্লক, রায়েরবাগ, কদমতলী, ঢাকা- ১৩৬২।
মোবাইল: ০১৬১২৩৪৬১১৯,ইমেইল: dhaka24news.top@gmail.com
ওয়েবসাইট: dhaka24news.top, ফেসবুক: https://www.facebook.com/DHAKA24NEWS.TOP/