প্রিন্ট এর তারিখঃ এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ৬:৩৭ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ৪:১৯ পি.এম
সোশ্যাল মিডিয়া কি তবে ‘সমান্তরাল সরকার’? জবাবদিহিতাহীন সাইবার সাম্রাজ্য ও নাগরিক নিরাপত্তাহীনতা
বিশেষ প্রতিবেদন
আধুনিক যুগে তথ্য আদান-প্রদানের প্রধান মাধ্যম হওয়ার কথা ছিল সোশ্যাল মিডিয়া। কিন্তু বাংলাদেশে এটি বর্তমানে এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। যেখানে কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই বিচার বসে, চরিত্র হনন করা হয় এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করা হয়। প্রশ্ন উঠেছে, সোশ্যাল মিডিয়া কি তবে রাষ্ট্রের প্রথাগত কাঠামোর বাইরে এক 'সমান্তরাল সরকার' বা 'বিকল্প বিচারালয়' হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
অদৃশ্য সুতোয় বন্দি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত
সম্প্রতি একটি সরকারি সংস্থায় মহাপরিচালক নিয়োগের ঘটনাটি সোশ্যাল মিডিয়ার এই দানবীয় প্রভাবের এক নগ্ন চিত্র তুলে ধরে। যোগ্য, সিনিয়র এবং সৎ একজন কর্মকর্তার পদোন্নতি যখন নিশ্চিত, ঠিক তখনই বিদেশ বিভুঁইয়ে বসে থাকা এক ইউটিউবারের প্রমাণহীন ভিডিওতে তার ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যায়।
ভয়ের সংস্কৃতি: ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জনরোষ বা ট্রলের ভয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে বাধ্য হন।
বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে: ভুক্তভোগী কর্মকর্তা আদালতের দ্বারস্থ হলেও বিচারক নিজেই নিরাপত্তাহীনতার কথা বলে মামলা গ্রহণে অপরাগতা প্রকাশ করেন।
সিন্ডিকেট রাজনীতি: পরে জানা যায়, এই পুরো নাটকটি সাজিয়েছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি পদটি হাতিয়ে নিতে ওই ইউটিউবারকে ‘ম্যানেজ’ করেছিলেন।
ব্ল্যাকমেল ও চাঁদাবাজির নতুন হাতিয়ার
সোশ্যাল মিডিয়া এখন কেবল মতপ্রকাশের জায়গা নয়, বরং এক শ্রেণির ‘ভিউ ব্যবসায়ীর’ অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার। এদের টার্গেট হন সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি—রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ী বা শিক্ষক।
ডিপফেক ও এআই ট্র্যাপ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও তৈরি করে তা ভাইরাল করার হুমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। সম্মান বাঁচাতে অনেকেই মুখ বুজে টাকা দিয়ে সমঝোতা করছেন।
চরিত্র হননের মহামারি: কোনো বাছবিচার ছাড়াই ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুৎসা রটানো হচ্ছে। এর ফলে ভেঙে যাচ্ছে সাজানো সংসার, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন।
আইনি শূন্যতা ও নাগরিকদের নিরাপত্তাহীনতা
২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের পর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করা হলেও নাগরিকদের সাইবার সুরক্ষার জন্য কোনো কার্যকর বিকল্প আইন না থাকা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
হুজুগে মামলা: দেখা গেছে, জুলাই পরবর্তী অনেক মামলার ভিত্তি ছিল কেবল সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই শুধু গালিগালাজ বা অপপ্রচারের ওপর ভিত্তি করে অনেককে আসামি করা হয়েছে।
সরকারের ভাবমূর্তি: গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে প্রতিনিয়ত সরকারকে বিব্রত করা হচ্ছে। অথচ এর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার মতো শক্তিশালী কোনো মেকানিজম এখনো দৃশ্যমান নয়।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশ কি পিছিয়ে?
বিশ্বের অন্যান্য দেশ সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্টদের (মেটা, গুগল) বলগাহীন দৌড় টেনে ধরতে সমর্থ হলেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে।
ভারতের উদাহরণ: ভারত তার আইটি রুলস (২০২১)-এর মাধ্যমে ফেসবুক-ইউটিউবকে দেশে অফিস করতে এবং স্থানীয় আইনের অধীনে আসতে বাধ্য করেছে। অতি সম্প্রতি অভিনেতা অক্ষয় কুমারের মেয়ের সাইবার হয়রানির ঘটনায় পুলিশি তৎপরতা ও দ্রুত গ্রেপ্তার প্রমাণ করে যে আইন সেখানে কার্যকর।
বিশ্বজুড়ে জরিমানা: আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স এবং অস্ট্রেলিয়া ডেটা সুরক্ষা ও অপতথ্য রোধে মেটা এবং গুগলকে কোটি কোটি ডলার জরিমানা করছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারী থাকলেও এখানে মেটা বা গুগলের কোনো শাখা অফিস নেই। অথচ প্রতি বছর দেশ থেকে কয়েকশ কোটি টাকা আয় করে নিয়ে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানগুলো।
উত্তরণের পথ: এখনই সময় লাগাম টানার
সোশ্যাল মিডিয়াকে ‘সমান্তরাল সরকার’ হওয়া থেকে আটকাতে এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
শাখা অফিস স্থাপন: মেটা, ইউটিউব ও গুগলকে বাংলাদেশে অফিস খুলতে বাধ্য করা, যাতে যেকোনো আপত্তিকর কন্টেন্ট দ্রুত সরিয়ে ফেলা যায়।
কঠোর ও স্বচ্ছ আইন: বাকস্বাধীনতা রক্ষা করে নাগরিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা ও সাইবার অপরাধ দমনে যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করা।
তদন্তে স্বচ্ছতা: সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টকে ধ্রুবসত্য না মেনে নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা: ইউটিউবার বা কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য নীতিমালা তৈরি করা, যাতে তারা তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতে বাধ্য থাকেন।
উপসংহার: নির্বাচিত সরকারের শক্তির উৎস হওয়া উচিত জনগণ, কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের 'লাইক' বা 'ভিউ' নয়। সোশ্যাল মিডিয়ার এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি দমন করতে না পারলে এটি কেবল ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্ব পালনে কঠোর হওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।