
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে এবার আমের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাকৃতিক চক্র অনুযায়ী এ বছর ‘অন ইয়ার’ হওয়ায় গাছে মুকুল ও ফলন দুটোই বেশি হয়েছে। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার আমের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে কৃষকেরা যেমন ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন, তেমনি দেশের বাজারেও আমের সরবরাহ বাড়বে।
তবে উৎপাদনের এ ইতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আম রপ্তানি নিয়ে। রপ্তানিকারকদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি আমের চাহিদা বাড়লেও উচ্চ বিমান ভাড়া এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে রপ্তানি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে উড়োজাহাজ ভাড়া অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানিকারকরা বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে কিছু দেশে রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
দেশের অন্যতম কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ট্রেড লিংক কয়েক বছর ধরে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে আম রপ্তানি করছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে তারা ৭৫ টন আম রপ্তানি করেছিল। পরে ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫৫ টনে এবং ২০২৫ সালে রপ্তানি আরও কমে ৩৫ টনে নেমে আসে। ধারাবাহিক এই পতনের মূল কারণ হিসেবে বাড়তি বিমান ভাড়াকে দায়ী করছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ রুবেল। তিনি বলেন, গত বছরও বড় পরিসরে আম রপ্তানির পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু উচ্চ পরিবহন ব্যয়ের কারণে সেই লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হয়নি। এ বছর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ইতোমধ্যে সুইজারল্যান্ড, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে আম রপ্তানি শুরু হলেও বিমান ভাড়া সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো যুক্তরাজ্যে প্রতি কেজি আম পরিবহনে প্রায় ৫০৫ টাকা নিচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি বিমান সংস্থা বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্স একই রুটে নিচ্ছে প্রায় ৫৮০ টাকা, যা রপ্তানিকারকদের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রপ্তানিকারকদের মতে, শুধু বিমান ভাড়াই নয়, বাগান থেকে রপ্তানিযোগ্য আম সংগ্রহ করতেও এখন প্রতি কেজিতে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। এরপর বাছাই, পরিষ্কার, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ও অভ্যন্তরীণ পরিবহনসহ অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হয়ে মোট খরচ দাঁড়াচ্ছে ১৫০ টাকারও বেশি। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় যোগ হলে প্রতি কেজি আম রপ্তানিতে মোট ব্যয় ৬৫০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাত্র কয়েক বছর আগেও যেখানে প্রতি কেজি আম রপ্তানিতে মোট ব্যয় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। গত বছরও এই ব্যয় ছিল প্রায় ৫০০ টাকা। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের আমের দাম ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বেশি হয়ে যাচ্ছে। অথচ স্বাদ, গন্ধ ও গুণগত মানে প্রতিযোগী দেশগুলোর আমের সঙ্গে বাংলাদেশের আমের খুব বেশি পার্থক্য নেই। রপ্তানিকারক কাওসার আহমেদ রুবেল বলেন, ভারত ও পাকিস্তান সরকার ফল রপ্তানি মৌসুমে বিশেষ কার্গো ফ্লাইট চালুর সুবিধা দেয়। এতে তাদের পরিবহন ব্যয় অনেক কম পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো সে ধরনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন দেশের রপ্তানিকারকরা। তার মতে, এ অবস্থা চলতে থাকলে এ বছর আম রপ্তানি আরও কমে যেতে পারে।
এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান। তিনি বলেন, এবার আমের উৎপাদন ভালো হলেও রপ্তানি ব্যাহত হলে কৃষকেরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। গত দুই বছরও নানা জটিলতার কারণে রপ্তানি আশানুরূপ হয়নি। তাই এবার রপ্তানি প্রতিবন্ধকতা দূর করতে বড় ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি জানান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে বিমান ভাড়া কমানো এবং আম রপ্তানিতে বিশেষ সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে। আগামী ২১ মে অনুষ্ঠিতব্য এক বৈঠকে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব তোলা হবে বলেও জানান তিনি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ২ হাজার ১৯৪ টন আম রপ্তানি হয়েছে। এর আগের বছর রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৩২১ টন। তবে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রপ্তানি হয়েছিল ২০২৩ সালে, যখন দেশ থেকে ৩ হাজার ১০০ টন আম বিদেশে পাঠানো হয়। তুলনামূলকভাবে ২০১৭ সালে রপ্তানি হয়েছিল মাত্র ৩০৯ টন।
বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৮টি দেশে আম রপ্তানি করছে। যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, কানাডা, জার্মানি, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সুইডেনসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি আমের চাহিদা রয়েছে। এছাড়া গত বছর প্রথমবারের মতো চীনে আম রপ্তানি হয়েছে। এ বছর নতুন করে মালয়েশিয়া, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াও বাংলাদেশি আম আমদানিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
এদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, এবার আম উৎপাদনে নতুন রেকর্ড হতে পারে। চলতি মৌসুমে দেশের দুই লাখ সাত হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ২৭ লাখ ৯৫ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর দুই লাখ পাঁচ হাজার হেক্টর জমি থেকে উৎপাদিত হয়েছিল ২৬ লাখ ৬২ হাজার টন আম। বর্তমানে দেশের ১৪টি জেলায় বাণিজ্যিকভাবে আমের ব্যাপক চাষ হচ্ছে। গোপালভোগ, হিমসাগর-খিরসাপাত, ল্যাংড়া, আম্রপালি, ফজলি, হাঁড়িভাঙ্গা ও গৌড়মতিসহ বিভিন্ন জাতের আম ধাপে ধাপে বাজারে আসছে। গত ৫ মে থেকে শুরু হওয়া আম সংগ্রহ মৌসুম চলবে আগামী ১৫ আগস্ট পর্যন্ত।
চাষিরা বলছেন, এ পর্যন্ত বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় উৎপাদন নিয়ে তারা আশাবাদী। তবে রপ্তানি পরিস্থিতির উন্নতি হলে কৃষকেরা আরও বেশি লাভবান হতেন। তারপরও স্থানীয় বাজারে দাম ভালো থাকলে এবার আম চাষে কৃষকেরা সন্তোষজনক মুনাফা পাবেন বলে আশা করছেন তারা।
প্রধান সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
যোগাযোগ: ১৯৮ সি-ব্লক, রায়েরবাগ, কদমতলী, ঢাকা- ১৩৬২।
মোবাইল: ০১৬১২৩৪৬১১৯,ইমেইল: dhaka24news.top@gmail.com
ওয়েবসাইট: dhaka24news.top, ফেসবুক: https://www.facebook.com/DHAKA24NEWS.TOP/