
নিজস্ব প্রতিবেদক
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। গত দেড় বছরের এই রাজনৈতিক ওঠানামার প্রভাবে সমাজজুড়ে এখনো বিরাজ করছে এক ধরনের অস্থিরতা। অন্যদিকে, পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া পুলিশ বাহিনীও রয়েছে কিছুটা দুর্বল অবস্থায়।

এমন সুযোগে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, সামাজিক প্রভাব ও পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে খুনখারাবি ও গুরুতর অপরাধ। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর দৃশ্যমান তৎপরতা কম থাকায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা পুলিশকে আরও কঠোর ভূমিকা নেওয়ার পাশাপাশি 'কমিউনিটি পুলিশিং' ব্যবস্থা জোরদার করার পরামর্শ দিচ্ছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের সংগৃহীত থানাভিত্তিক মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিগত দুই বছরের তুলনায় চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে হত্যাকাণ্ডের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে সারাদেশে মোট ১,১৪২টি হত্যা মামলা হয়েছে। এই সংখ্যা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসের তুলনায় যথাক্রমে ১৩.৫২% এবং ১২.২৯% বেশি।
বিগত তিন বছরের প্রথম চার মাসের (জানুয়ারি-এপ্রিল) তুলনামূলক চিত্র:
| বছর | জানুয়ারি | ফেব্রুয়ারি | মার্চ | এপ্রিল | মোট হত্যা মামলা |
| ২০২৪ | ২৩১ | ২৪০ | ২৩৯ | ২৯৬ | ১,০০৬টি |
| ২০২৫ | ২৯৪ | ২১৭ | ২৩৯ | ২৬৭ | ১,০১৭টি |
| ২০২৬ | ২৮৭ | ২৫০ | ৩১৭ | ২৮৮ | ১,১৪২টি |
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করাচ্ছেন, এই পরিসংখ্যান কেবল দায়ের হওয়া মামলার ভিত্তিতে তৈরি। বাস্তবে অপরাধ সংঘটনের পর অনেক ঘটনাই মামলার আওতার বাইরে থেকে যায়, ফলে প্রকৃত অপরাধের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে ঘটা অন্তত ১৫টি আলোচিত অপরাধের ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পারিবারিক সহিংসতা, অর্থ ও জমি নিয়ে বিরোধ, মাদক এবং গ্যাং কালচারের জেরেই বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড ঘটছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতির পেছনে লুণ্ঠিত অস্ত্র ও কারাগার থেকে পলাতক আসামিদের একটি বড় ভূমিকা দেখছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে খোদ পুলিশ সদস্যরাও প্রতিনিয়ত মব (উত্তেজিত জনতা) ও অপরাধীদের হামলার শিকার হচ্ছেন।
চলতি বছরের প্রথম চার মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় দেশজুড়ে ২১৩টি মামলা হয়েছে (জানুয়ারিতে ৪২, ফেব্রুয়ারিতে ৪২, মার্চে ৬৩ এবং এপ্রিলে ৬৬টি)। গত ২০২৪ ও ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২০২ এবং ২২৩টি।
"সরকার পুনর্গঠনের সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা" > — অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক (ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) > "অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ অপরাধ ঘটছে। বর্তমান নতুন রাজনৈতিক সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুনর্গঠনের কাজ করছে। এই ট্রানজিশন পিরিয়ডের কারণে গুরুতর অপরাধ দমনে তারা প্রত্যাশিত মাত্রায় মনোযোগ দিতে পারছে না, আর অপরাধীরা সেই সুযোগটিই নিচ্ছে। পুলিশকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক চাপমুক্ত ও নিরপেক্ষ হয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে।"
"কমিউনিটি ও বিট পুলিশিং জোরদার করা জরুরি" > — আব্দুল কাইয়ুম (সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক - আইজিপি) > "বর্তমানে সামাজিক বা রাজনৈতিকভাবে একই গোষ্ঠীর মধ্যে অনেকগুলো উপদল (গ্রুপিং) তৈরি হয়েছে, কেউ কারও কথা মানছে না। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সাধারণ লোকবল নয়, বরং সমাজের ভালো ও গ্রহণযোগ্য মানুষদের সম্পৃক্ত করে 'কমিউনিটি পুলিশিং' ও 'বিট পুলিশিং' কার্যকর করতে হবে। গত ১৫ বছরে পুলিশের ওপর মানুষের যে আস্থা ও শ্রদ্ধা কমে গিয়েছিল, তা পুরোপুরি ফেরাতে বাস্তবমুখী জনসংযোগ ও দৃশ্যমান ভূমিকা প্রয়োজন।"

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ.এইচ.এম. শাহাদাত হোসেন জানান, অপরাধ দমনে বাংলাদেশ পুলিশ দেশব্যাপী সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, "শীর্ষ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, কিশোর গ্যাং এবং পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করতে আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় টহল ও চেকপোস্ট বৃদ্ধির ফলে ইতিবাচক অগ্রগতিও দেখা যাচ্ছে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "সমাজে পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফেরাতে পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন। ছোটখাটো সামাজিক বা ব্যক্তিগত বিরোধ যাতে কোনোভাবেই সহিংসতা বা হত্যাকাণ্ডে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে।"
প্রধান সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
যোগাযোগ: ১৯৮ সি-ব্লক, রায়েরবাগ, কদমতলী, ঢাকা- ১৩৬২।
মোবাইল: ০১৬১২৩৪৬১১৯,ইমেইল: dhaka24news.top@gmail.com
ওয়েবসাইট: dhaka24news.top, ফেসবুক: https://www.facebook.com/DHAKA24NEWS.TOP/