
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার বহুল আলোচিত মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং স্বপ্না আক্তারকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রোববার (৭ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ রায় ঘোষণা করেন। আলোচিত এ মামলার তদন্ত থেকে রায় পর্যন্ত পুরো বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে মাত্র ১৭ দিনের মধ্যে। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত এলাকায় নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সকাল ৮টা ২৯ মিনিটে আসামি স্বপ্না আক্তারকে এবং সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে কড়া পুলিশি পাহারায় প্রধান আসামি সোহেল রানাকে আদালতে হাজির করা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান জানান, রায়কে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত তিন প্লাটুন পুলিশ মোতায়েন করা হয়। আগে থেকে দায়িত্বে থাকা সদস্যদের সঙ্গে মিলিয়ে শতাধিক পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। গত ১৯ মে নিজ বাসার পাশের একটি ফ্ল্যাটে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় দ্বিতীয় শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী। ঘটনাটি দেশব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং দ্রুত বিচারের দাবিতে বিভিন্ন মহল থেকে সোচ্চার প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
ঘটনার দিনই প্রধান আসামি সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। একই সময় আটক করা হয় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে। পরদিন শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় সোহেল রানাকে প্রধান আসামি এবং স্বপ্নাসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়। তদন্ত চলাকালে ডিএনএ প্রতিবেদন, ফরেনসিক আলামত, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত বিভিন্ন প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়। তদন্তকারীদের মতে, এসব সাক্ষ্য-প্রমাণ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছে।
দ্রুত তদন্ত শেষে ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। অভিযোগপত্রে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়। পরে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। ১ জুন দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

পরদিন রাষ্ট্রপক্ষের ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন শিশুটির বাবা-মা, বড় বোন, প্রতিবেশী, তদন্ত কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে সোহেল রানা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। স্বপ্না আক্তারও নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
পরবর্তীতে যুক্তিতর্ক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, ডিএনএ প্রতিবেদন, ফরেনসিক আলামত এবং অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে দুই আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানায়। বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু আদালতে বলেন, তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘চেইন অব ফ্যাক্ট’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা আসামিদের অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োজিত আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ সোহেল রানার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে লাশ গুমে সহযোগিতার অভিযোগে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের আবেদন করেন।
রায়ের আগে এক গোলটেবিল বৈঠকে শিশুটির বাবা বলেন, “আমি শুধু আমার মেয়ের বিচার চাই না; এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে আর কোনো শিশুকে এ ধরনের নির্মম ঘটনার শিকার হতে হবে না।” তদন্ত, অভিযোগপত্র, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্ক—সব ধাপ শেষ করে মাত্র ১৭ দিনের মধ্যেই বহুল আলোচিত এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
প্রধান সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
যোগাযোগ: ১৯৮ সি-ব্লক, রায়েরবাগ, কদমতলী, ঢাকা- ১৩৬২।
মোবাইল: ০১৬১২৩৪৬১১৯,ইমেইল: dhaka24news.top@gmail.com
ওয়েবসাইট: dhaka24news.top, ফেসবুক: https://www.facebook.com/DHAKA24NEWS.TOP/