
স্পোর্টস ডেস্ক
ফুটবলের সর্বকালের সেরা কে—লিওনেল মেসি নাকি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, নাকি অন্য কোনো কিংবদন্তি? এই প্রশ্ন নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের বিতর্কের যেন শেষ নেই। প্রায় দুই দশক ধরে চলা এই বিতর্কে এবার সরাসরি না হলেও বেশ সৃজনশীলভাবেই নিজের অবস্থান জানিয়ে দিলেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি লিওনেল মেসি।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর ঘোষণার মাত্র কয়েক দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেসির একটি ব্যতিক্রমী পোস্ট প্রকাশ্যে এসেছে। সেখানে কোনো দীর্ঘ বক্তব্য নয়, বরং রেস্তোরাঁ বা বারের বিলের আদলে সাজানো হয়েছে আর্জেন্টিনার হয়ে তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সাফল্য ও পরিসংখ্যান। পোস্টটির শেষ লাইনে লেখা—‘GOAT debate: settled’, অর্থাৎ ‘সর্বকালের সেরা নিয়ে বিতর্কের ইতি’। ফলে পোস্টটি প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
মেসির প্রকাশিত ভিডিওটি আসলে একটি ব্র্যান্ড ক্যাম্পেইনের অংশ। ‘Tab Closed’ নামের এই প্রচারণায় তাঁর আর্জেন্টিনা ক্যারিয়ারকে একটি দীর্ঘ বারের রসিদের মতো করে উপস্থাপন করা হয়েছে।
রসিদের একের পর এক লাইনে উঠে এসেছে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বিভিন্ন অর্জন—গোল, অ্যাসিস্ট, ম্যাচ, খেলার সময় এবং বড় বড় শিরোপা। অর্থাৎ, সাধারণ কোনো বিলের মতো এখানে খাবার বা পানীয়ের হিসাব নেই; বরং রয়েছে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির দুই দশকের সাফল্যের হিসাব।
রসিদের শেষ দিকে এসে সবচেয়ে নজরকাড়া বার্তাটি দেওয়া হয়েছে—‘GOAT debate: settled’। ‘GOAT’ শব্দটি ‘Greatest of All Time’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ, যা কোনো খেলায় সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপ, ২০২২ সালের ফিনালিসিমা এবং ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা জয়। এর সঙ্গে রয়েছে ২০০৮ সালের অলিম্পিক স্বর্ণপদকও।
বিশ্বকাপ জয়ের সাফল্য অবশ্যই এই তালিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। সেই টুর্নামেন্টে মেসি ছিলেন দলের প্রধান তারকা এবং ফাইনালেও করেছিলেন দুটি গোল।
এরপর ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকা জিতে আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয়বার মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। ফলে জাতীয় দলের হয়ে মেসির ক্যারিয়ারে একে একে যুক্ত হয় প্রায় সব বড় আন্তর্জাতিক সাফল্য।

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির পথচলা অবশ্য শুরু থেকেই সাফল্যে ভরা ছিল না। বরং দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে শুনতে হয়েছে সমালোচনা।
২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের পর আর্জেন্টিনার সমর্থকদের হতাশার বড় কারণ হয়ে উঠেছিল সেই পরাজয়। এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালেও শিরোপা জিততে পারেনি আর্জেন্টিনা।
২০১৬ সালে চিলির কাছে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন মেসি। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে জাতীয় দলে ফিরে আসেন তিনি।
সেই প্রত্যাবর্তনের পরই যেন বদলে যায় পুরো গল্প।
২০২১ সালে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার দীর্ঘ শিরোপাখরা কাটে। এরপর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে হারিয়ে মেসির সবচেয়ে বড় স্বপ্নও পূরণ হয়।
কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ। নির্ধারিত ৯০ মিনিট ও অতিরিক্ত সময় শেষে আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের ম্যাচ ৩-৩ সমতায় শেষ হয়।
মেসি সেই ম্যাচে দুটি গোল করেন। পরে টাইব্রেকারেও নিজের শট থেকে গোল করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ৪-২ ব্যবধানে টাইব্রেকারে জয় পেয়ে ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে তোলে।
এই শিরোপার মাধ্যমে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতাও দূর হয়। দীর্ঘদিনের সমালোচনা ও হতাশার পর আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ জিতে নিজেকে আরও উঁচু জায়গায় নিয়ে যান তিনি।

২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের অংশ। টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনা ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত স্পেনের কাছে হেরে রানার্সআপ হয়। মেসি এই বিশ্বকাপের পরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত জানান।
৩১ আগস্ট ২০২৬, ৩৯ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান মেসি। আর্জেন্টিনার হয়ে ২০ বছরের বেশি সময়ের ক্যারিয়ার শেষ করার সময় তাঁর নামের পাশে ছিল ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল।
বিশ্বকাপেও মেসি নিজের নাম লিখিয়েছেন ইতিহাসে। ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষে পাঁচটি বিশ্বকাপে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২১, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
মেসির এই ‘রসিদ’ পোস্টের সময়টিও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেওয়ার পরপরই পোস্টটি সামনে এসেছে। ফলে অনেকেই এটিকে তাঁর আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের একটি সৃজনশীল ‘শেষ হিসাব’ হিসেবে দেখছেন।
রসিদের প্রতিটি লাইনে তাঁর অর্জনগুলো যোগ হওয়ার পর শেষে কোনো অর্থের হিসাব দেওয়া হয়নি। বরং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে লেখা হয়েছে—‘GOAT debate: settled’।
অর্থাৎ, মেসি নিজে সরাসরি ‘আমি সর্বকালের সেরা’—এমন কোনো দীর্ঘ বক্তব্য না দিলেও বিজ্ঞাপনী প্রচারণার এই সৃজনশীল উপস্থাপনায় তাঁর ক্যারিয়ারের অর্জনগুলোকে সামনে রেখে সেই বার্তাই যেন দেওয়া হয়েছে।
মেসির এই পোস্ট স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘদিনের মেসি-রোনালদো বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। দুই তারকার ভক্তরা প্রায় দুই দশক ধরে গোল, শিরোপা, ব্যক্তিগত পুরস্কার, রেকর্ড এবং জাতীয় দলের সাফল্য নিয়ে নিজেদের পছন্দের খেলোয়াড়কে সেরা প্রমাণের চেষ্টা করে আসছেন।
মেসির সমর্থকদের কাছে ২০২২ বিশ্বকাপ জয় তাঁর সবচেয়ে বড় যুক্তিগুলোর একটি। অন্যদিকে রোনালদোর সমর্থকেরাও আন্তর্জাতিক ও ক্লাব ফুটবলে তাঁর দীর্ঘ সাফল্য এবং গোলের রেকর্ডকে সামনে আনেন।
তাই মেসির পোস্টের ‘GOAT debate: settled’ লাইনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাভাবিকভাবেই নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কেউ এটিকে মজার বিজ্ঞাপনী প্রচারণা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন মেসি তাঁর ক্যারিয়ারের অর্জন দিয়েই নিজের উত্তর দিয়ে দিয়েছেন।
ফুটবলের সর্বকালের সেরা নিয়ে বিতর্ক হয়তো কোনোদিনই পুরোপুরি শেষ হবে না। কারণ ভিন্ন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের তুলনা করা সবসময়ই কঠিন। তবে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট—ব্যর্থতা, সমালোচনা ও হতাশা পেরিয়ে তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে এমন এক অধ্যায় লিখেছেন, যেখানে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও অলিম্পিক স্বর্ণপদকসহ বড় বড় অর্জন রয়েছে।
আর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের পর নিজের সেই দীর্ঘ ক্যারিয়ারকে একটি ‘রসিদে’ সাজিয়ে মেসি যেন বলে দিলেন—হিসাব শেষ, এখন সিদ্ধান্ত পাঠকের।
রসিদের একেবারে শেষে তাই লেখা—‘GOAT debate: settled’। এই একটি লাইনই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেসির নতুন পোস্টের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।
প্রধান সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
যোগাযোগ: ১৯৮ সি-ব্লক, রায়েরবাগ, কদমতলী, ঢাকা- ১৩৬২।
মোবাইল: ০১৬১২৩৪৬১১৯,ইমেইল: dhaka24news.top@gmail.com
ওয়েবসাইট: dhaka24news.top, ফেসবুক: https://www.facebook.com/DHAKA24NEWS.TOP/