
ঢাকা২৪নিউজ
শহরের ব্যস্ত সড়ক, ফুটপাত কিংবা অলিগলি দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ যাতায়াত করেন। কেউ কর্মস্থলে, কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, আবার কেউ প্রয়োজনীয় কাজে ছুটে চলেন গন্তব্যের দিকে। কিন্তু এই পরিচিত চলার পথেই কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে প্রাণঘাতী বিপদ। খোলা, ভাঙা কিংবা ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল তেমনই এক নীরব বিপদের নাম। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার কারণে এসব ম্যানহোল পানির নিচে তলিয়ে গেলে পথচারীদের পক্ষে সেগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। সামান্য অসতর্কতা কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলায় ঘটতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
নগরবাসীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সড়ক ও ফুটপাতের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পয়োনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার নিরাপত্তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ অনেক এলাকায় ম্যানহোলের ঢাকনা ভাঙা, সরে যাওয়া কিংবা হারিয়ে যাওয়ার পরও যথাসময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে পথচারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও রাতের বেলায় চলাচলকারীদের জন্য এসব স্থান বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে।

ম্যানহোল হলো সড়ক, ফুটপাত কিংবা অন্যান্য স্থানে নির্মিত এমন একটি প্রবেশপথ, যার মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পয়োনিষ্কাশন, ড্রেনেজ ও বিভিন্ন ইউটিলিটি লাইনের পরিদর্শন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং মেরামতের কাজ করা হয়। নগরের পানি নিষ্কাশন ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখতে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ম্যানহোলের ঢাকনা অক্ষত রাখা, নিয়মিত পরিদর্শন করা এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না হলে এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোই জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। একটি ম্যানহোলের ঢাকনা না থাকা কিংবা যথাযথভাবে স্থাপন না করা শুধু অব্যবস্থাপনার চিত্র নয়, বরং তা পথচারীদের জীবন ও নিরাপত্তার জন্য সরাসরি ঝুঁকি তৈরি করে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জনবহুল শহরে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা একটি পরিচিত সমস্যা। ভারী বৃষ্টিতে সড়ক, ফুটপাত ও অলিগলিতে পানি জমে গেলে খোলা ম্যানহোল কিংবা অরক্ষিত ড্রেনের অবস্থান বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। পানি সরতে থাকা অবস্থায়ও অনেক সময় এসব বিপজ্জনক স্থান দৃশ্যমান থাকে না।
এমন পরিস্থিতিতে পথচারীরা স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে গিয়ে বিপদে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে যানবাহন চলাচলের সময়ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি আরও উদ্বেগজনক, কারণ তারা অনেক সময় রাস্তার বিপদ সম্পর্কে সচেতন থাকে না। তাই বর্ষা শুরুর আগেই ম্যানহোল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার নিরাপত্তা যাচাই করা জরুরি।
মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২১ জুন গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস এলাকায় ভারী বৃষ্টির পর পানিতে তলিয়ে থাকা একটি অরক্ষিত ড্রেনে পড়ে এক নারীর মৃত্যু হয়। একই বছরের ২৫ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর-১০-এর সেনপাড়া এলাকায় ম্যানহোলের কাজ করার সময় গাড়িচাপায় ওয়াসার এক কর্মীর মৃত্যুর ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের আগস্টে টানা ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর ধানমন্ডি, মিরপুর ও কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এসব পরিস্থিতি নগরবাসীর স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত করার পাশাপাশি অরক্ষিত ম্যানহোল ও ড্রেনের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।
মূল প্রতিবেদনে গত পাঁচ বছরে ম্যানহোল-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় ২৯ জনের মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যানের উৎস ও হিসাবের আওতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা গেলে সমস্যাটির প্রকৃত ব্যাপ্তি নিরূপণ এবং কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হবে।
ম্যানহোলের ঝুঁকির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে নিয়মিত পরিদর্শনের অভাব, ভাঙা বা হারিয়ে যাওয়া ঢাকনা দ্রুত প্রতিস্থাপন না করা, রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা।
কিছু ক্ষেত্রে ম্যানহোলের ধাতব ঢাকনা চুরি করে ভাঙারি হিসেবে বিক্রি করার ঘটনাও নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ। ঢাকনা চুরি হয়ে যাওয়ার পর দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা না নিলে বিপজ্জনক গর্তটি উন্মুক্ত অবস্থায় থেকে যায়। আবার কোথাও মেরামতের কাজ চললেও যথাযথ ব্যারিকেড, সতর্কসংকেত ও নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা না থাকলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। এসব সমস্যা প্রতিরোধে শুধু দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নিলেই হবে না; বরং নিয়মিত তদারকি, দ্রুত মেরামত এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
১. ঢাকনা না থাকলে দ্রুত ব্যারিকেড স্থাপন: কোনো ম্যানহোলের ঢাকনা ভেঙে গেলে, সরে গেলে কিংবা চুরি হয়ে গেলে দ্রুত বিপদসংকেত, দৃশ্যমান ব্যারিকেড ও প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। শুধু অস্থায়ীভাবে ঢেকে রাখলেই দায়িত্ব শেষ হবে না; স্থায়ী সমাধানও নিশ্চিত করতে হবে।
২. টেকসই ও নিরাপদ ঢাকনা ব্যবহার: ম্যানহোলের ঢাকনা এমন উপকরণ দিয়ে তৈরি করা প্রয়োজন, যা দীর্ঘস্থায়ী, ভারবহনক্ষম এবং সহজে খুলে নেওয়া যায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী লকিং ব্যবস্থা, নিরাপদ সংযোগ এবং চুরি প্রতিরোধী নকশা ব্যবহার করা যেতে পারে। ডাকটাইল আয়রন, উপযুক্ত আরসিসি কিংবা ফাইবার রিইনফোর্সড উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট স্থানের ভারবহনক্ষমতা ও কারিগরি মান বিবেচনা করতে হবে।
৩. আধুনিক সেন্সর প্রযুক্তির ব্যবহার: গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ম্যানহোলের ঢাকনা সরে যাওয়া বা খুলে নেওয়ার ঘটনা শনাক্ত করতে স্মার্ট সেন্সর ব্যবহার করা যেতে পারে। এসব সেন্সরের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণকক্ষে সতর্কবার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতিও নিশ্চিত করতে হবে।
৪. বর্ষার আগে ম্যানহোল অডিট: বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাকে সমন্বিতভাবে ম্যানহোল পরিদর্শন করতে হবে। কোথায় ঢাকনা ভাঙা, কোথায় পানি জমছে, কোথায় মেরামত প্রয়োজন—এসব তথ্য নথিভুক্ত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ শেষ করতে হবে।
৫. নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ: ম্যানহোল ও ড্রেনেজ লাইনে ময়লা জমে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হলে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ে। তাই নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ঢাকনার অবস্থা পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় মেরামত নিশ্চিত করতে হবে। বিপজ্জনক স্থানগুলো শনাক্ত করার জন্য হালনাগাদ তালিকা বা ডিজিটাল মানচিত্রও তৈরি করা যেতে পারে।
৬. আইন প্রয়োগ ও প্রশাসনিক জবাবদিহি: ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি, অবৈধভাবে অপসারণ কিংবা দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কোনো ম্যানহোল অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা কত দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে, তা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
৭. জনসচেতনতা ও দ্রুত অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা: অরক্ষিত ম্যানহোল দেখলে পথচারীদের সেটি এড়িয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। শিশুদের রাস্তা ও ফুটপাতে চলাচলের সময় বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্থানীয় প্রচার ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে নাগরিকদের সতর্ক করা যেতে পারে। জরুরি অভিযোগ জানানোর জন্য কার্যকর হটলাইন বা ডিজিটাল রিপোর্টিং ব্যবস্থাও চালু রাখা জরুরি।
একটি আধুনিক নগরী গড়ে তোলার অর্থ শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো নির্মাণ নয়। নগরীর প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাধারণ মানুষ নিরাপদে রাস্তায় চলাচল করতে পারেন এবং প্রতিদিনের যাতায়াতে প্রাণঘাতী ঝুঁকির মুখে পড়তে হয় না। খোলা ম্যানহোলের মতো সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি, দ্রুত মেরামত, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কার্যকর জবাবদিহি অপরিহার্য। পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি ঢাকনা সময়মতো স্থাপন করা, একটি বিপজ্জনক স্থান চিহ্নিত করা কিংবা একটি অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া—এসব উদ্যোগই সম্ভাব্য দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই অবহেলা নয়, প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ ও সমন্বিত কার্যক্রম। অরক্ষিত ম্যানহোলের ঝুঁকি দূর করে নগরবাসীর জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলাই হোক সংশ্লিষ্ট সবার অঙ্গীকার।
প্রধান সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
যোগাযোগ: ১৯৮ সি-ব্লক, রায়েরবাগ, কদমতলী, ঢাকা- ১৩৬২।
মোবাইল: ০১৬১২৩৪৬১১৯,ইমেইল: dhaka24news.top@gmail.com
ওয়েবসাইট: dhaka24news.top, ফেসবুক: https://www.facebook.com/DHAKA24NEWS.TOP/