নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও একাধিক দফা পিছিয়ে যাওয়ার পর অবশেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উঠছে বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীর নাব্য সংকট, কৃষি উৎপাদন হ্রাস এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা মোকাবিলায় এটিকে অন্যতম বৃহৎ পানি ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের জন্য প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। যদিও পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। প্রকল্পটি জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বুধবার (১৩ মে) সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য একনেক সভায় মোট ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হবে। এর মধ্যে ১১ নম্বর কার্যতালিকায় রয়েছে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প।
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, প্রকল্পটির যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষা। তিনি জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা কমবে, কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে। মৃতপ্রায় নদীগুলোতে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরবে, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বাড়বে এবং সুন্দরবনসহ দক্ষিণাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পর থেকেই বাংলাদেশের পদ্মা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৭৫ সালে ভারত পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ করে গঙ্গার পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে প্রবাহিত করার মাধ্যমে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার উদ্যোগ নেয়। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের অংশে পদ্মার পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর ওপর। হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতির মতো নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ কমে গিয়ে অনেক স্থানে নদী শুকিয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে লবণাক্ততা, কমছে সুপেয় পানির প্রাপ্যতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি, মৎস্য, বন ও জীববৈচিত্র্য। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পদ্মা নদীতে রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় একটি বড় ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হলো বর্ষা-পরবর্তী সময়ে পানি সংরক্ষণ এবং শুষ্ক মৌসুমে নিয়ন্ত্রিতভাবে বিভিন্ন নদী ব্যবস্থায় স্বাদু পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এক ধাপে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন, তদারকি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে প্রকল্পটিকে দুই ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ব্যারাজের মূল অবকাঠামো নির্মাণ, গড়াই-মধুমতি ও হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদী সিস্টেম পুনঃখননের কাজ করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী সিস্টেম পুনরুদ্ধার এবং অতিরিক্ত অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, প্রথম ধাপে মূল ব্যারাজ ছাড়াও গড়াই অফটেক স্ট্রাকচারে দুটি হাইড্রো-পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।
প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট, নেভিগেশন লক, ফিশ পাস এবং ব্যারাজের ওপর দিয়ে রেলওয়ে সেতু। পাশাপাশি নদীপথে নৌচলাচল স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও গড়ে তোলা হবে।
এছাড়া গড়াই, হিসনা ও চন্দনা নদীর অফটেক অবকাঠামো নির্মাণ, নদী ড্রেজিং, নদী পুনঃখনন এবং ফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। গড়াই-মধুমতি নদী ব্যবস্থায় প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার এবং হিসনা নদী সিস্টেমে প্রায় ২৪৬ কিলোমিটার পুনঃখনন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ কমবে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। প্রকল্পের আওতায় শুষ্ক মৌসুমে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে এবং ধান উৎপাদন বাড়তে পারে প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন। পাশাপাশি মাছ উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রকল্প এলাকা দেশের চারটি বিভাগের ১৯টি জেলা ও ১২০টি উপজেলায় বিস্তৃত হবে। এর মধ্যে রয়েছে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী ও পিরোজপুরসহ বিভিন্ন জেলা। তবে প্রকল্পটি নিয়ে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাও আলোচনায় রয়েছে। কারণ ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন ইস্যুতে নতুন সমঝোতা ও কূটনৈতিক আলোচনার প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেন, প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনার একটি বড় উদ্যোগ। এটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ ও নদী পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসতে পারে। তবে নদীর উজানে ক্ষয়, ভাটিতে পলি জমা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধু নদী ও পরিবেশ নয়, দেশের কৃষি, বিদ্যুৎ, নৌচলাচল, সুপেয় পানি সরবরাহ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119