“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

লাল বাতিতে ব্রেক, দাগ ছুঁলেই মামলা

এআই ক্যামেরার নজরদারিতে বদলাচ্ছে ঢাকার ট্রাফিক চিত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম সড়কগুলোর একটিতে এখন নতুন এক দৃশ্য চোখে পড়ছে। ট্রাফিক সিগন্যালে লাল বাতি জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে মুহূর্তেই থেমে যাচ্ছে গাড়ির সারি। জেব্রা ক্রসিং কিংবা স্টপ লাইনের সাদা দাগ অতিক্রম করার সাহসও করছেন না চালকরা। কারণ একটাই—রাস্তার ওপর এখন কড়া নজর রাখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা। সাদা দাগ ছুঁলেই হতে পারে ডিজিটাল মামলা। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর বিজয় সরণি মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারা ছাড়াই নিয়ম মেনে থেমে আছে যানবাহন। মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, বাস কিংবা সিএনজি—সব চালকের মধ্যেই বাড়তি সতর্কতা।

মোটরসাইকেলচালক মোঃ সোহেল বলেন, “ভাই, এখন এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। সিগন্যাল অমান্য করলে বা স্টপ লাইনের ওপর চাকা গেলেই অটো মামলা হয়ে যাবে।” একই কথা বলেন সিএনজি অটোরিকশাচালক দিদারুল ইসলাম। তার ভাষায়,
“ফেসবুকে দেখেছি নিয়ম না মানলে বাসায় মামলা চলে যাচ্ছে। তাই এখন সাবধানে গাড়ি চালাই।”


প্রযুক্তির ভয়ে ফিরছে শৃঙ্খলা

দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকার সড়কে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফেরাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা সফল হয়নি। তবে এবার প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার কারণে দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, এআইভিত্তিক ক্যামেরা চালুর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই সড়কে আইন মানার প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে। আগের মতো ট্রাফিক সদস্যদের বাঁশি বাজানো বা হাতের ইশারার প্রয়োজন পড়ছে না। চালকরাও আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামছেন না।

বিজয় সরণিতে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট আলমাস হাসান বলেন, “এআই ক্যামেরা পুরোপুরি ডিএমপি হেডকোয়ার্টার থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কেউ আইন ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবেই। এখানে কোনো তদবির বা সুপারিশ চলবে না।”


“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

কীভাবে কাজ করছে এআই ক্যামেরা

ডিএমপির তথ্যমতে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ১০৫টি ট্রাফিক সিগন্যাল পয়েন্টে এআইভিত্তিক ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এসব ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ঘটনা শনাক্ত করে ভিডিও ফুটেজ সংরক্ষণ করছে। ব্যবহৃত হচ্ছে “রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট-২০১৮ ভায়োলেশন ডিটেকশন সফটওয়্যার”, যা গাড়ির নম্বর প্লেট শনাক্ত করে তথ্য সংগ্রহ করে। পরে সেই তথ্য যাচাই করে ডিজিটাল মামলা পাঠানো হচ্ছে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিক বা চালকের কাছে।

ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে যেসব অপরাধ শনাক্ত করা হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • লাল বাতি অমান্য
  • স্টপ লাইন ভঙ্গ
  • জেব্রা ক্রসিং দখল
  • উল্টো পথে চলাচল
  • হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো
  • সিটবেল্ট না পরা
  • গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার
  • অবৈধ পার্কিং
  • অনুমতি ছাড়া ভিআইপি লাইট ব্যবহার

পিটিজেড ক্যামেরায় দূর থেকেও শনাক্ত হচ্ছে নম্বর প্লেট

ডিএমপি জানিয়েছে, এআই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক পিটিজেড (প্যান-টিল্ট-জুম) ক্যামেরা। এসব ক্যামেরা দূর থেকে গাড়ির নম্বর প্লেট পর্যন্ত স্পষ্টভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম।

এই প্রযুক্তির বিশেষ সুবিধা হলো—

  • ক্যামেরা ডানে-বামে ও ওপর-নিচে ঘোরানো যায়
  • চলন্ত যানবাহনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুসরণ করতে পারে
  • অপটিক্যাল জুমের মাধ্যমে দূরের দৃশ্যও পরিষ্কার দেখা যায়
  • বড় এলাকা একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ সম্ভব

যেসব এলাকায় বসানো হয়েছে এআই ক্যামেরা

রাজধানীর গুলশান-১ ও ২, উত্তরা, বিমানবন্দর সড়ক, মহাখালী, শাহবাগ, বাংলামোটর, বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, মৎস্য ভবন, সচিবালয়, কাকরাইল, গাবতলী, মিরপুর রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সিগন্যাল এলাকায় ইতোমধ্যে এই প্রযুক্তি চালু করা হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, আগে যেখানে ট্রাফিক পুলিশ না থাকলে অনেক চালক নিয়ম ভাঙতেন, এখন সেখানে ক্যামেরার উপস্থিতিতেই তৈরি হয়েছে বাড়তি সচেতনতা।


চারদিনে ১০ হাজার ফুটেজ, মামলা ৫০০

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ মে পরীক্ষামূলকভাবে এআই প্রযুক্তি চালু হওয়ার পর ১৩ মে পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে তিন হাজারের বেশি ফুটেজ ইতোমধ্যে যাচাই করা হয়েছে। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট শারমিন আফরোজ বলেন, “১৩ মে একদিনেই ৭৪৮টি আইন ভঙ্গের ফুটেজ পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে বেশি আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।” অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান জানান, “এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০টি মামলা পাঠানো হয়েছে। যাচাই শেষে আগামী সাতদিনের মধ্যে এসএমএস ও ডাকযোগে নোটিশ পৌঁছে যাবে।”


ট্রাফিক পুলিশ ছাড়াই আইন মানছেন চালকরা

শাহবাগ মোড়ে প্রাইভেটকারচালক কবির হোসেন বলেন, “আগে অনেক চালক সিগন্যাল না মেনে চলে যেত। এখন সবাই অনেক সতর্ক। মোটরসাইকেলচালকরাও নিয়ম মানছে।” ফার্মগেটে অপেক্ষমাণ যাত্রী ফাবিহা তাবাসসুম বলেন, “আগে রাস্তা পার হতে ভয় লাগতো। এখন চালকরা অনেক ধীরে ও সতর্কভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন। প্রযুক্তির কারণে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে।”


অ্যাম্বুলেন্সের ক্ষেত্রে থাকবে মানবিকতা

এআই ক্যামেরায় রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স ধরা পড়লে কী হবে—এমন প্রশ্নও উঠেছে। বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, “রোগী নামানোর সময় অনেক সময় রাস্তার পাশে দাঁড়াতে হয়। আমাদের জন্য আলাদা নির্দেশনা থাকা দরকার।” এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আনিছুর রহমান বলেন, “সব কিছু কেবল আইনের দৃষ্টিতে দেখা যায় না। জরুরি সেবার ক্ষেত্রে মানবিক দিক বিবেচনা করা হবে।”


সামনে বড় চ্যালেঞ্জ নম্বর প্লেট জটিলতা

ডিএমপি জানিয়েছে, অনেক গাড়ির নম্বর প্লেট অস্পষ্ট অথবা নির্ধারিত মানের নয়। কিছু যানবাহনে আবার আরএফআইডি ট্যাগও অকার্যকর। ফলে অনেক গাড়ি শনাক্ত করতে সমস্যা হচ্ছে। এ কারণে চলতি সপ্তাহ থেকেই বিআরটিএ অনুমোদিত নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ।


প্রযুক্তির নজরদারিতে বদলাচ্ছে চালকদের আচরণ

ডিএমপি কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার বলেন, “এআই প্রযুক্তি কার্যকর হওয়ার ফলে চালকদের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন।” সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করা গেলে রাজধানীর সড়কে যানজট কমার পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাতেও বড় পরিবর্তন আসবে। সবচেয়ে বড় কথা, ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি ছাড়াই চালকদের নিয়ম মানতে বাধ্য করছে এআই ক্যামেরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Play sound