নিজস্ব প্রতিবেদক
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম বর্তমানে অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। ২০১০ সালে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন থাকা ২৯টি মামলার ১০৫ জন আসামির কেউ বর্তমানে কারাগারে নেই। অধিকাংশই জামিনে মুক্ত রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোতে অগ্রাধিকার দেওয়ায় একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার কার্যক্রম কার্যত ধীরগতি হয়ে পড়েছে।
বিচারাধীন ২৯ মামলা, নেই কোনো আসামি কারাগারে
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের হওয়া ২৯টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ১০৫ জন। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিচারিক কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এবং কোনো আসামিই এখন কারাগারে নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ট্রাইব্যুনালের বিচারক, তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউশন টিমের বেশ কয়েকজন সদস্য পদত্যাগ করেন। পরে অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করলেও নতুন করে জুলাই-আগস্টের সহিংসতার মামলাগুলো অগ্রাধিকার পেতে শুরু করে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল ট্রাইব্যুনালের বিচার
২০০৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালের ২৫ মার্চ পুরান হাইকোর্ট ভবনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। মামলার সংখ্যা বাড়তে থাকায় ২০১২ সালের ২২ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গঠন করা হয়। পরে মামলার চাপ কমে গেলে ২০১৩ সালের অক্টোবরে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল মোট ৫৯টি মামলার রায় ঘোষণা করে। এসব মামলায় ১৯৭ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সাজা দেওয়া হয়। এর মধ্যে আপিল বিভাগে ১০টির বেশি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে এবং ৪০টিরও বেশি মামলা এখনও আপিল পর্যায়ে রয়েছে।
১৫ বছরে ৫৯ মামলার রায়, কার্যকর হয় ৬ মৃত্যুদণ্ড
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল কয়েকজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর। সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে মোট ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাদের মধ্যে পাঁচজন ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা এবং একজন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিরা হলেন—
- জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লা
- মুহাম্মদ কামারুজ্জামান
- আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ
- জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী
- জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলী
- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী
এ ছাড়া জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী আমৃত্যু কারাদণ্ড ভোগরত অবস্থায় মারা যান। অন্যদিকে, আপিল বিভাগের রায়ে জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পান।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ধারাবাহিকতা
২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রথম মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার।
এরপর ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল ফাঁসি কার্যকর করা হয় মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের। একই বছরের ২২ নভেম্বর একসঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর।
২০১৬ সালের ১১ মে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় মতিউর রহমান নিজামীর। একই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর কাশিমপুর কারাগারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় মীর কাসেম আলীর।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মামলায় বেশি গুরুত্ব
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে সংঘটিত হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে একের পর এক মামলা জমা পড়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এসব মামলার তদন্ত ও বিচারকে এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
তার ভাষ্য, “২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর বিচার বর্তমানে বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। সে কারণে ১৯৭১ সালের বিচারাধীন মামলাগুলোর কার্যক্রম আপাতত ধীরগতিতে চলছে।” বর্তমানে পুনর্গঠিত দুটি ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলার বিচার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্রথম রায় ছিল আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রথম রায় ঘোষণা করা হয় ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি। ওই রায়ে জামায়াতে ইসলামীর রোকন মাওলানা আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। পরে রাষ্ট্রপতি তার সাজা এক বছরের জন্য স্থগিত করেন। দীর্ঘ সময় পলাতক থাকার পর ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর তিনি ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করেন। আদালত তাকে “যেমন আছেন, তেমন থাকার” নির্দেশ দেন।

ট্রাইব্যুনালের সামনে নতুন বাস্তবতা
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলেও বর্তমানে বিচার প্রক্রিয়া নতুন বাস্তবতার মুখে পড়েছে। একদিকে বিচারাধীন পুরোনো মামলা, অন্যদিকে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ—এই দুই ধরনের মামলার চাপ সামাল দিতে গিয়ে ট্রাইব্যুনালকে নতুন করে কৌশল নির্ধারণ করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. মাহমুদুল হাসান জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের আগের বিচারাধীন ২৯টি মামলার সব আসামিই বর্তমানে জামিনে রয়েছেন এবং কারাগারে কোনো আসামি নেই।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119