হাতছাড়া হচ্ছে হাজার কোটি টাকার বিশ্ববাজার
নিজস্ব প্রতিবেদক
ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশের মসলা পণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও কেবল ‘গামা রেডিয়েশন’ বা তেজস্ক্রিয়তা সেবার অভাবে এই বিশাল রপ্তানি বাজার এখন হুমকির মুখে। উন্নত বিশ্বে খাদ্যপণ্য, পশুখাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী পাঠানোর আগে সেগুলোকে তেজস্ক্রিয়তার মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত করা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে এই সেবা দেওয়ার সক্ষমতা প্রায় ফুরিয়ে আসায় বেসরকারি খাতের রপ্তানি বাণিজ্য এখন বন্ধের উপক্রম হয়েছে।
১. সক্ষমতার তলানিতে সরকারি প্রতিষ্ঠান
বাংলাদেশে পরমাণু শক্তি গবেষণা কমিশনের অধীনে দুটি প্রতিষ্ঠান এই সেবা প্রদান করে থাকে:
- আইআরপিটি (সাভার): ২০০৯ সালে ৩৫০ কিলো কিউরি ক্ষমতা নিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে এর সক্ষমতা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪০ কিলো কিউরিতে। ফলে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে এখানে বাণিজ্যিক সেবা প্রায় বন্ধ।
- আইএফআরবি: এর অবস্থা আরও নাজুক। প্রতিষ্ঠাকালে ৫০ কিলো কিউরি সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে তা মাত্র ২০ কিলো কিউরিতে নেমেছে। বর্তমানে এটি কেবল গবেষণার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
২. রপ্তানিকারকদের সংকট ও বাজার হারানো
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি মসলার চাহিদা বছরে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টন। কিন্তু প্রয়োজনীয় জীবাণুমুক্তকরণ সেবার অভাবে বছরে কয়েকশ টনও রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না।
- প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ: প্রতিষ্ঠানের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জানান, মাত্র ৬-৭ টন মসলা জীবাণুমুক্ত করতে তাদের দেড় মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সক্ষমতা থাকলে মাসে ১৫০ টন রপ্তানি করা সম্ভব হলেও সেবার অভাবে মাসে ৫০-৬০ টনের অর্ডার হাতছাড়া হচ্ছে।
- স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ: প্রতিষ্ঠানের সিইও পারভেজ সাইফুল ইসলাম জানান, গত তিন বছর ধরে এই সমস্যায় তারা উত্তর আমেরিকার বাজার প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন। পর্যাপ্ত সেবা পেলে রপ্তানি বর্তমানের তুলনায় ১০ গুণ বাড়ানো সম্ভব।
রপ্তানিকারকরা আক্ষেপ করে জানান, প্রতিবেশী দেশ ভারতে যেখানে ২৬টি গামা তেজস্ক্রিয়তা কেন্দ্র রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে সরকারি কেন্দ্রগুলো অচল হয়ে পড়ে আছে।
৩. কেন আটকে আছে সমাধান?
আইআরপিটির সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ৬৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল, যার মেয়াদ ২০২৫ সালের জুনে শেষ হয়েছে। যন্ত্রাংশ ও রেডিয়েশন সোর্স (কোবাল্ড-৬০) রাশিয়া থেকে এলেও সেগুলো স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
বাধা যেখানে: প্রকল্পের কাজ করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা রোসাটমের একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর সাথে রাশিয়ার সরাসরি লেনদেন বন্ধ থাকায় কারিগরি সহায়তার কাজ থমকে আছে। তবে কর্তৃপক্ষ আশা করছে, বিকল্প পথে লেনদেন মিটিয়ে আগামী ৩-৪ মাসের মধ্যে ৪০০ কিলো কিউরি ক্ষমতার নতুন মেশিনটি চালু করা সম্ভব হবে।
৪. আশার আলো: নতুন প্রকল্প
সংকট নিরসনে গাজীপুরের ভবানীপুরে একটি নতুন গামা সেন্টার স্থাপন করছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)।
- ব্যয় ও বাস্তবায়ন: বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণ করছে চীনের একটি প্রতিষ্ঠান।
- বর্তমান অবস্থা: প্রকল্পের কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ।
- সময়সীমা: ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে এটি চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
৫. ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
আইআরপিটির সংস্কার কাজ শেষ হলে এবং বিনার নতুন কেন্দ্রটি চালু হলে বছরে প্রায় ৫ হাজার টন পণ্য জীবাণুমুক্ত করা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত এই কারিগরি সংকট সমাধান করতে পারলে মসলা রপ্তানি খাতে বাংলাদেশ পুনরায় তার হারানো বাজার ফিরে পাবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখবে।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119