মোঃ জাকির হোসেন
দারুল ইক্বরা মডেল মাদ্রাসার ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের কৃতি শিক্ষার্থীদের পুরস্কার বিতরণ এবং ১৩ জন ছাত্রকে পবিত্র কুরআনের সবক প্রদান অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল ২১ মে ২০২৬, রোজ বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
প্রধান অতিথির মূল্যবান দিক-নির্দেশনা
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যাত্রাবাড়ী বড় মাদ্রাসা খ্যাত জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়ার প্রখ্যাত মুফাসসির, হযরত মাওলানা মুফতি আশরাফ উদ্দিন। তিনি উপস্থিত ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে ভবিষ্যৎ গঠন এবং হকের পথে চলার জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা ও পরামর্শ দেন।
প্রধান অতিথি তাঁর বক্তব্যে শিক্ষকদের মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন: “সন্তানের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে হলে অভিভাবকদের অবশ্যই শিক্ষকদের (ওস্তাদদের) সাথে সদাচরণ করতে হবে এবং তাঁদের নিকট সন্তানের জন্য দোয়া চাইতে হবে। কোনো ছাত্রের জন্য যদি ওস্তাদের হাত শেষ রাতে তাহাজ্জুদের সময় আল্লাহর দরবারে উঠে, তবে ইনশাআল্লাহ সেই ছাত্রকে আল্লাহ পাক দুনিয়া ও আখিরাতে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন স্থানে পৌঁছে দেবেন।” উপস্থিত অভিভাবকবৃন্দ প্রধান অতিথির এই মূল্যবান পরামর্শকে সাধুবাদ জানান এবং এটি সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠনে সহায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

নিরাপত্তা ও ব্যতিক্রমী শিক্ষাপদ্ধতি
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করা এই মাদ্রাসাটির শিক্ষার মান অত্যন্ত চমৎকার। বর্তমানে এখানে হেফজ বিভাগের পাশাপাশি চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদান চলছে। মাদ্রাসায় মোট ৮ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা কর্মরত আছেন, যার মধ্যে ৪ জন নারী শিক্ষিকা। প্লে ও নার্সারির কোমলমতি শিশুদের মায়ের মমতায় যত্ন নেওয়ার জন্য এই শিক্ষিকাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পুরুষ শিক্ষক রয়েছেন ৪ জন।
মাদ্রাসার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অভিভাবকরা অত্যন্ত সন্তুষ্ট। প্লে-গ্রুপের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান:
- নিরাপত্তা: অভিভাবকদের উপস্থিতি বা অনুমতি ছাড়া কোনো ছাত্র-ছাত্রী মাদ্রাসার মেইন গেট দিয়ে বাইরে বের হতে পারে না, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক ও আস্থার প্রতীক।
- চাপহীন শিক্ষা: এখানে শিশুদের ওপর কোনো মানসিক বা শারীরিক চাপ দেওয়া হয় না। প্লে-গ্রুপের বাচ্চাদের জন্য কোনো ধরাবাঁধা সিলেবাস নেই। ক্লাসে যা পড়ানো হয়, সেটাই পরীক্ষার প্রস্তুতি।
- ব্যতিক্রমী খাতা পদ্ধতি: শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লাসে সিডব্লিউ (CW) এবং বাসায় এইচডব্লিউ (HW) খাতা ব্যবহার করা হয়। শ্রেণী শিক্ষকেরা প্লে-নার্সারির বাচ্চাদের হাত ধরে সিডব্লিউ খাতায় লেখা শিখিয়ে দেন এবং সেই লেখাই এইচডব্লিউ হিসেবে বাসায় চর্চা করতে দেওয়া হয়।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে জিসানের বিস্ময়কর সাফল্য
এবারের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন ও নজরকাড়া মুহূর্ত ছিল তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র জিসানের সাফল্য। জিসান একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী; সে ঠিকমতো হাঁটতে পারে না, এমনকি হাত দিয়ে ভালো করে কলমও ধরতে পারে না। বছরের একটা বড় সময় সে অসুস্থতায় ভুগেছে। কিন্তু সমস্ত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা এবং মুখস্থ বিদ্যার দুর্বলতাকে জয় করে, সুস্থ-সবল অন্য সব সহপাঠীদের পেছনে ফেলে জিসান এবার শ্রেণীতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। জিসানের এই অভাবনীয় সাফল্য পুরো মাদ্রাসার জন্য এক গর্বের বিষয়। উপস্থিত সুধীজন মন্তব্য করেন, ভালো বা মেধাবী ছাত্রকে সবাই পড়াতে পারে। কিন্তু একজন অসুস্থ ও পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীকে পরম ধৈর্য ও ভালোবাসার মাধ্যমে ভালো রেজাল্ট এনে দিতে পারেন কেবল একজন খাঁটি শিক্ষক। দারুল ইক্বরা মাদ্রাসার শিক্ষকেরা আল্লাহ প্রদত্ত সেই ধৈর্য ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন।

আমানত রক্ষা ও মুহতামিমের আবেগঘন বক্তব্য
মাদ্রাসার সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকা২৪নিউজ-এর সাথে কথা বলেন দারুল ইক্বরা মডেল মাদ্রাসার মুহতামিম হযরত মাওলানা মুফতি মাসুম বিল্লাহ মাহমুদি। মাদ্রাসাটি নিয়ে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে তিনি অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
মুফতি মাসুম বিল্লাহ মাহমুদি বলেন: “এই মাদ্রাসা নিয়ে আমার একটাই ফিকির (চিন্তা)—অভিভাবকেরা তাঁদের আদরের সন্তানদের আমার কাছে আমানত হিসেবে রেখে যান। আমি যেন এই আমানতের খিয়ানত না করি এবং প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীর হক সঠিকভাবে আদায় করতে পারি।
আল্লাহ পাকের কাছে আমার এটুকুই চাওয়া, অর্থের অভাবে যেন কোনো ছাত্র-ছাত্রীর পড়ালেখা বন্ধ না হয়।” আবেগঘন মুহূর্তে তিনি মাদ্রাসার বর্তমান আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে আরও বলেন, “আমার এই প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ ভাড়ায় চালিত। ভবনের ভাড়া এবং কর্মরত ৮ জন শিক্ষকের বেতন পরিশোধ করে মাদ্রাসা পরিচালনা করতে আমার কিছুটা কষ্ট হচ্ছে। তবুও আল্লাহ পাকের দরবারে লাখো শুকরিয়া যে, তিনি আমাদের এখন পর্যন্ত সুন্দরভাবে টিকিয়ে রেখেছেন, আলহামদুলিল্লাহ্।” নির্দলীয় ও নিঃস্বার্থ এই শিক্ষানুরাগী আলেমের হাত ধরে দারুল ইক্বরা মডেল মাদ্রাসাটি আগামীতে আরও বহুদূর এগিয়ে যাবে এবং এলাকার দ্বীনি শিক্ষার আলো ছড়াবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন স্থানীয় সচেতন মহল।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119