শোকস্তব্ধ বরগুনার মামুন দম্পতি
একটি হাসিখুশি সংসার মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মাত্র নয় মাস আগে বরগুনার মামুন ও তাঁর স্ত্রীর কোল আলো করে এসেছিল প্রথম সন্তান ইশহাক। তার আধো-আধো বুলি আর চঞ্চলতায় মুখর থাকত ঘর। কিন্তু আজ সেই ঘরে শুধু হাহাকার। উন্নত চিকিৎসার আশায় গ্রাম থেকে রাজধানী ছুটে এলেও, শেষ রক্ষা হলো না। শুক্রবার (১ মে) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পিআইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় ছোট্ট ইশহাকের।
চিকিৎসার অন্তহীন এক মাস ও বাবার আক্ষেপ
ইশহাকের বাবা মামুন জানান, গত এক মাস ধরে সন্তানকে বাঁচাতে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটেছেন তিনি। খরচ করেছেন আড়াই লাখ টাকারও বেশি। তবুও খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে তাকে। ঘটনার শুরু এক মাস আগে, যখন ইশহাকের নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। বরগুনা সদর হাসপাতালে দুবার ভর্তি করা হলেও সেখানকার চিকিৎসা পদ্ধতিতে ত্রুটি ছিল বলে অভিযোগ বাবার। মামুন জানান, চিকিৎসক মেহেদী পারভেজ সাত দিন চিকিৎসা দিয়ে রিলিজ দিলেও কোনো এক্স-রে করে নিশ্চিত হননি যে নিউমোনিয়া পুরোপুরি সেরেছে কি না। ফলে বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ে শিশুটি।

বরিশাল থেকে ঢাকা: জীবনের শেষ লড়াই
বরগুনায় অবস্থার অবনতি হলে ইশহাককে বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় রেফার করা হয়। ঢাকায় এসেও শুরু হয় ভোগান্তি। সরকারি হাসপাতালে তাৎক্ষণিক সিট না পেয়ে দুই দিন বেসরকারি হাসপাতালে রাখতে হয়। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে সিট মিললেও সেখানে নতুন আপদ হিসেবে দেখা দেয় হাম। পিআইসিইউ-তে থাকা অবস্থায় শরীরে র্যাশ বা লাল দানা উঠতে শুরু করে। এরপর তাকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে (এমআইসিইউ) স্থানান্তর করা হলেও শুক্রবার সকালে সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে সে না ফেরার দেশে চলে যায়।
শিশু হাসপাতালের শোকাতুর পরিবেশ
শুক্রবার দুপুরে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। তোয়ালেতে মোড়ানো ইশহাকের নিথর দেহ নিয়ে যখন তার বাবা-মা বের হয়ে আসছিলেন, তখন তাদের বুকফাটা কান্নায় শিশু হাসপাতালের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। একটি অপেক্ষমাণ অ্যাম্বুলেন্সে করে ছোট্ট ইশহাককে নিয়ে স্বজনরা রওনা হন বরগুনা সদর উপজেলার পাতাকাটা গ্রামের উদ্দেশে। সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত হবে এই শিশু।
দেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি: একটি জাতীয় সতর্কতা
ইশহাকের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশ বর্তমানে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করছে।
পরিসংখ্যান এক নজরে (১৫ মার্চ থেকে বর্তমান):
- মোট মৃত্যু (নিশ্চিত): ৪৯ জন।
- সন্দেহভাজন মৃত্যু: ২২৭ জন।
- নিশ্চিত আক্রান্ত: ৫,০২৮ জন।
- সন্দেহভাজন আক্রান্ত: ৩৭,১৩১ জন।
- হাসপাতালে ভর্তি: ২৫,১৫৮ জন।
সরকারের পদক্ষেপ
এই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় এপ্রিলের শুরু থেকেই দেশব্যাপী হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রথম ডোজ টিকা গ্রহণের বয়স কমিয়ে ৬ মাস করা হয়েছে। এছাড়া সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আইসোলেশন ওয়ার্ড বৃদ্ধি এবং দ্রুত টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, শিশুদের তীব্র জ্বর বা শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে। সঠিক সময়ে টিকাদানই পারে ইশহাকের মতো আর কোনো প্রাণ যাতে ঝরে না যায় তা নিশ্চিত করতে।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119