“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

সোশ্যাল মিডিয়ার বিষচক্র: ধ্বংসের মুখে নতুন প্রজন্ম, বিশ্বজুড়ে বাড়ছে কঠোর নিয়ন্ত্রণ

অদিতি করিম

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতার নাম শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি। যে বয়সে হাতে বই থাকার কথা, সেই বয়সে স্মার্ট ডিভাইসের নীল আলোয় ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ। এক সময়ের খেলার মাঠের কোলাহল এখন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে চার ইঞ্চি পর্দার ডিজিটাল গোলকধাঁধায়। এই অবাধ ও নিয়ন্ত্রণহীন ভার্চুয়াল জগত আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছে এক ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে।

১. আসক্তির মূলে ডিজিটাল অ্যালগরিদম

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো (ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব) এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে ট্রিলিয়ন ডলারের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর মনোযোগ সর্বোচ্চ সময় ধরে রাখতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি আরও মারাত্মক। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের ফলে তাদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে:

  • মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়া: সৃজনশীলতা কমে যাওয়া এবং বিষণ্নতা ও উদ্বেগ বৃদ্ধি।
  • শারীরিক সমস্যা: চোখের ক্ষতি, ঘুমের অভাব এবং স্থূলতা।
  • সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: বাস্তব জগতের মানুষের সাথে যোগাযোগ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

২. কিশোর গ্যাং ও তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার

বাংলাদেশে কিশোর অপরাধ বা ‘কিশোর গ্যাং’ কালচার বিস্তারে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা এখন প্রমাণিত।

  • সংগঠিত অপরাধ: ফেসবুক মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ব্যবহার করে অতি দ্রুত বিশাল কিশোর দল জমায়েত হচ্ছে। আধিপত্য বিস্তার, হামলা এমনকি খুনের মতো ঘটনাও ঘটছে এই ডিজিটাল সমন্বয়ের মাধ্যমে।
  • অশ্লীলতা ও ইভ টিজিং: নিয়ন্ত্রণহীন অশ্লীল কনটেন্ট দেখে কিশোররা ইভ টিজিং এবং যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
  • ব্ল্যাকমেইলিং: প্রেমের ফাঁদে ফেলে অশ্লীল ভিডিও ধারণ ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক।

৩. বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: বিশ্ব যখন জেগে উঠেছে

সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতি কেবল অভিভাবকের তদারকি দিয়ে ঠেকানো সম্ভব নয়—এই সত্যটি এখন উন্নত বিশ্ব স্বীকার করে নিয়েছে। ফলে দেশে দেশে শুরু হয়েছে কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণ:

  • অস্ট্রেলিয়া: বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে।
  • যুক্তরাজ্য: একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য সরকারের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
  • চীন: শিশুদের জন্য কঠোর নিয়ম জারি করেছে; ১৪ বছরের কম বয়সীদের স্ক্রিন টাইম দিনে মাত্র ৪০ মিনিটে সীমাবদ্ধ এবং রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ইন্টারনেট ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
  • অন্যান্য দেশ: ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও নরওয়েও শিশুদের সুরক্ষায় কঠোর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের মানসিক ক্ষতির দায়ে মেটা ও গুগল-এর মতো টেক জায়ান্টদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

৪. বাংলাদেশের উদ্বেগজনক পরিস্থিতি

সারাবিশ্ব কঠোর পদক্ষেপ নিলেও বাংলাদেশের অবস্থান এ ক্ষেত্রে এখনো উদাসীন। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে:

  • বাল্যবিবাহ ও আত্মহত্যা: গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু গত বছরেই সোশ্যাল মিডিয়া সংক্রান্ত জটিলতায় অন্তত ২০৯টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।
  • নিরাপত্তা ঝুঁকি: অনলাইন বুলিং, প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের কারণে কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

৫. দায় কার: অভিভাবক নাকি রাষ্ট্র?

অনেক সময় মা-বাবারা শিশুদের শান্ত রাখতে বা খাওয়ানোর ‘শর্টকাট’ হিসেবে হাতে মোবাইল তুলে দেন। এটি সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদী আসক্তি তৈরি করছে। তবে একটি সাধারণ পরিবারের পক্ষে বিশ্বখ্যাত টেক জায়ান্টদের জটিল অ্যালগরিদমের সাথে লড়াই করা প্রায় অসম্ভব। তাই এক্ষেত্রে কেবল অভিভাবকদের সচেতনতাই যথেষ্ট নয়, রাষ্ট্রেরও বড় ভূমিকা রয়েছে।

উপসংহার

সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের শিশুদের জীবনীশক্তি কেড়ে নিচ্ছে, নষ্ট করছে বই পড়ার অভ্যাস। এই সমস্যাকে উপেক্ষা করার আর সুযোগ নেই। আমাদের শিশু-কিশোরদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সোশ্যাল মিডিয়াকে একটি কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে আনা এখন সময়ের দাবি। সরকারের উচিত হবে এই বিষয়টিকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করা।


লেখক: লেখক ও নাট্যকার
ইমেইলঃ auditekarim@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *