সরকারি তথ্যে নেই হদিস, রহস্য ঘনীভূত
নিজস্ব প্রতিবেদক
লজিস্টিক সুবিধা এবং দ্রুত সরবরাহের কারণে ভারত থেকে বাংলাদেশের কৃষিজাত পণ্য আমদানির নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে ২.৪ বিলিয়ন ডলারের কৃষিজাত পণ্য আমদানি করা হয়েছে, যা মোট আমদানির ২১.২৫ শতাংশ। তবে এই আমদানির তালিকায় থাকা পণ্যের হিসাব নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের বিতর্ক ও ধোঁয়াশা।
ভারতের দাবি: মহিষের মাংসই প্রধান রফতানি পণ্য
ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা ‘কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ (APEDA)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারত থেকে যে পরিমাণ কৃষিপণ্য কিনেছে, তার মধ্যে ব্যয়ের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে মহিষের মাংস।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানির প্রধান খাতসমূহ (ভারতের হিসাব অনুযায়ী):
- মহিষের মাংস: ৫৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলার (শীর্ষ পণ্য)
- নন-বাসমতী চাল: ৩৫ কোটি ৮৮ লাখ ডলার
- মসলা: ৩২ কোটি ৬ লাখ ডলার
- ফুল ও শোভাময় গাছ: ২১ কোটি ৭৮ লাখ ডলার
- পেঁয়াজ: ২০ কোটি ৪৫ লাখ ডলার
বাংলাদেশের নীতি: মাংস আমদানি নিষিদ্ধ
ভারতের সরকারি সংস্থা যখন মহিষের মাংসকে শীর্ষ রফতানি পণ্য হিসেবে দেখাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের সরকারি নথিতে এর কোনো অস্তিত্বই নেই। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দাবি, দেশে মাংস আমদানির কোনো অনুমতিই দেওয়া হয় না।
সরকারের ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২৪’ অনুযায়ী, গরু, ছাগল বা মুরগির মাংস আমদানির ক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি বা NOC নেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে বিভাগীয় কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে এই ধরনের কোনো অনুমতি প্রদান করা হচ্ছে না।
“আমরা কোনো ধরনের মাংস আমদানির অনুমতি দিই না। তবে পাঁচ তারকা হোটেলগুলোর জন্য অত্যন্ত সীমিত পরিসরে বিশেষ মানের মাংস আমদানির সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই পরিমাণ কোনোভাবেই ৫৭ কোটি ডলার হওয়ার কথা নয়।” — ডা. মো. বয়জার রহমান, পরিচালক (ট্রেড শাখা), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।
গরমিল যেখানে: রহস্যের কেন্দ্রে ৫৭ কোটি ডলার
ভারতের হিসাব এবং বাংলাদেশের মাঠপর্যায়ের চিত্রের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয় থেকে মাংস আমদানির কোনো অনাপত্তি সনদ দেওয়া হয় না।
প্রশ্ন উঠছে কয়েকটি জায়গায়:
- যদি সরকারিভাবে অনুমতি না থাকে, তবে ভারত থেকে ৫ হাজার কোটি টাকারও (বাংলাদেশি মুদ্রায়) বেশি মূল্যের মাংস কোথায় গেল?
- এই বিপুল পরিমাণ পণ্য কি অন্য কোনো নামে (Misdeclaration) আমদানি করা হয়েছে?
- নাকি ভারতের রফতানি তথ্যে কোনো বড় ধরনের কারিগরি ভুল রয়েছে?
খাতসংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ
দেশের পশুপালন খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত মাংস উৎপাদিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যদি বিপুল পরিমাণ হিমায়িত মাংস অবৈধ উপায়ে বা ভুল তথ্যে দেশে প্রবেশ করে, তবে স্থানীয় খামারিরা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন।
ভারতের রফতানি তথ্যে মহিষের মাংসের এই বিশাল অংক এখন বড় ধরনের তদন্তের দাবি রাখছে। শুল্ক গোয়েন্দা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) যদি দ্রুত এর রহস্য উদ্ঘাটন না করে, তবে সরকারের বড় অংকের রাজস্ব ফাঁকি এবং স্থানীয় বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119