“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

‘সিলিন্ডার নাই, ২ হাজার ৪০০ টাকা দিলে ম্যানেজ করে দিতে পারি’

সরকার নির্ধারিত ১,৫৮৫ টাকার বদলে ২–২.৫ হাজারে বিক্রি, কোথাও আবার ‘সিলিন্ডার নেই’ অজুহাত; পর্যাপ্ত আমদানির পরও কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে প্রায় ১ হাজার টাকা বেশি দামে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। কোথাও আবার ‘সিলিন্ডার নেই’ বলে ক্রেতাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে বেশি দাম দিতে রাজি হলে গোপনে সিলিন্ডার ‘ম্যানেজ’ করে দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হচ্ছে।

সরকার নির্ধারিত হিসাবে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অথচ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সেটিই বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। কোথাও কোথাও নতুন বোতলসহ সিলিন্ডার কিনতে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে।

‘২ হাজার ৪০০ টাকা দিলে ম্যানেজ করে দিতে পারি’

টঙ্গীর এক খুচরা এলপিজি বিক্রেতা মো. মিঠু রহমানের কাছে রোববার সকালে ক্রেতা সেজে সিলিন্ডার কেনার জন্য যোগাযোগ করা হয়। প্রথমে তিনি জানান, তার কাছে কোনো সিলিন্ডার নেই।

পরে ‘গ্যাস না থাকায় বাসায় রান্না হচ্ছে না, যেভাবেই হোক একটি সিলিন্ডার ম্যানেজ করে দিতে হবে’—এমন অনুরোধ করা হলে তিনি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৪০০ টাকা চান।

ওই বিক্রেতা বলেন, ‘সিলিন্ডার এমনিতেই নেই। দাম ২ হাজার ৪০০ টাকা দেবেন। দেখি যদি ম্যানেজ করে দিতে পারি। বিকেলে একবার ফোন দিয়েন।’

“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” ✉ Email: dhaka24news.top@gmail.com

রাজধানীতেও একই চিত্র

শুধু টঙ্গী নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতেও এলপিজি সিলিন্ডারের বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

রোববার সকালে রাজধানীর আজিমপুর, ধানমন্ডিসহ কয়েকটি এলাকায় খুচরা সিলিন্ডার বিক্রির দোকান ঘুরে দেখা যায়, অনেক দোকান বন্ধ। আবার যেসব দোকানে অন্যান্য পণ্যের পাশাপাশি এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করা হয়, সেখানেও অনেক ক্ষেত্রে ‘সিলিন্ডার নেই’ বলে জানানো হচ্ছে।

আজিমপুরের এক বিক্রেতা জানান, সিলিন্ডার পাওয়া যাবে, তবে দাম পড়বে ২ হাজার ৫০০ টাকা। আর নতুন বোতলসহ কিনতে হলে দিতে হবে ৪ হাজার টাকা।

এতে ক্রেতাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো রান্নার জ্বালানি কিনতে গিয়ে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ

এলপিজি সিলিন্ডারের অস্বাভাবিক দাম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ভোক্তারা।

‘বাংলাদেশ এলপিজি সিলিন্ডার এক্সচেঞ্জ পয়েন্ট গ্রুপ’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে সুমাইয়া ইসলাম নামে একজন লিখেছেন, দুইটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে তাকে ৪ হাজার ৯০০ টাকা দিতে হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সাধারণ মানুষ এভাবে বাড়তি দামে গ্যাস কিনে কীভাবে সংসার চালাবে।

বাবু মিয়া নামে আরেক ব্যক্তি একটি ভিডিও পোস্ট করে ২ হাজার টাকা দিয়ে গ্যাস কেনার কথা জানিয়েছেন।

এদিকে ‘৬৪ জেলা এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটর অ্যাসোসিয়েশন’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে মো. রাসেল লিখেছেন, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের পক্ষে গ্যাস কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

নরসিংদী থেকে নিতে হবে, দাম ২ হাজার টাকা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এলপিজি বিক্রির তথ্য দেওয়া একটি পেজে থাকা নম্বরে ক্রেতা পরিচয়ে যোগাযোগ করা হলে রাকিব নামে এক বিক্রেতা জানান, তার কাছে কিছু সিলিন্ডার রয়েছে। তবে পরিমাণ কম।

তিনি বলেন, ‘সিলিন্ডার আছে, তবে কম। ২ হাজার টাকা চলতেছে। নরসিংদী থেকে নিতে হবে।’

অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় এখানেও প্রতি সিলিন্ডারে কয়েকশ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।

সাতক্ষীরায় ১ হাজার ৮০০ টাকা

‘এলপি গ্যাসের বাজার’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ থেকে সাতক্ষীরার এক খুচরা ব্যবসায়ীর নম্বর সংগ্রহ করে যোগাযোগ করা হলে মো. লাবিব নামে ওই ব্যবসায়ী জানান, তার কাছে কিছু এলপিজি রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘গ্যাস আছে। আমরা ১ হাজার ৮০০ টাকা করে বিক্রি করতেছি। ওমেরা, আই গ্যাস, ফ্রেশ—এগুলো আছে। অনেক বেশি নেই, টুকটাক আছে, বিক্রি করা যাচ্ছে।’

তার দাবি, শহরের কাছাকাছি হওয়ায় তারা ডিলার পয়েন্ট থেকে গ্যাস পাচ্ছেন। তবে গ্রামাঞ্চলে সরবরাহ পরিস্থিতি কেমন, তা তিনি বলতে পারেননি।

আমদানিতে ঘাটতি নেই

এলপিজির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সংশ্লিষ্টদের তথ্য বলছে, দেশে এলপিজি আমদানিতে বড় ধরনের ঘাটতি নেই।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ও খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ এলপিজি আমদানি হয়েছে।

বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগস্টে আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৫৭ হাজার মেট্রিক টন।

ফলে শুধু আমদানি ঘাটতির কারণে বাজারে বর্তমান সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

১২ আমদানিকারকের কাছে তথ্য চেয়েছে বিইআরসি

বাজারে এলপিজির সরবরাহ ও দামের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ১২টি এলপিজি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাছে সেপ্টেম্বর মাসের আমদানি ও বিক্রির তথ্য চেয়েছে বিইআরসি।

শনিবার (৩ অক্টোবর) প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়। সেখানে রোববারের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে পাওয়া আমদানির তথ্যও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, আমদানিকারকদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছি। মিনিস্ট্রি কাজ করছে। জেলা পর্যায় পর্যন্ত তদারকি করা হচ্ছে। আজ নতুন দাম ঘোষণা করা হবে। এরপর আরও কঠোরভাবে মনিটরিং করা হবে।’

দেশজুড়ে ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযান

সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ তদারকি অভিযান পরিচালনা করেছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

শনিবার (৩ অক্টোবর) ঢাকা ও দেশের ১৬ জেলায় ডিলার, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের এলপিজি বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হয়।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ২৩টি টিম একযোগে এসব অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখা, এলপিজির স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্য আদায় বন্ধ করতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

কৃত্রিম সংকট তৈরি না করার নির্দেশ

অভিযানের সময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে মূল্যতালিকা প্রদর্শন, ক্রয়-বিক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ ও ক্রেতাকে ভাউচার দেওয়ার বিষয়টি যাচাই করা হয়।

এ ছাড়া সিলিন্ডারের নিরাপত্তা বিধি মানা হচ্ছে কি না এবং মেয়াদোত্তীর্ণ বা ত্রুটিপূর্ণ সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে কি না, তাও পরীক্ষা করা হয়।

ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অযৌক্তিকভাবে সিলিন্ডার মজুত এবং সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা তৈরি থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দৃশ্যমান স্থানে হালনাগাদ মূল্যতালিকা প্রদর্শন এবং সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

ভোক্তাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ

এলপিজি সিলিন্ডার কেনার আগে ওজন, সিল, মেয়াদ এবং সিলিন্ডারে কোনো দৃশ্যমান ত্রুটি রয়েছে কি না তা পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

এ ছাড়া দোকানে প্রদর্শিত মূল্যতালিকা যাচাই করে সিলিন্ডার কেনা এবং অবশ্যই ক্রয়ের রশিদ বা ভাউচার সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।

কোনো ব্যবসায়ী সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম নিলে বা এলপিজি বিক্রিতে কোনো অনিয়ম করলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১-এ অভিযোগ জানানো যাবে।

  • আরও পড়ুন

‘এলপিজি সরকার আমদানি করে না’

এদিকে এলপিজির বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।

রোববার সকালে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘এলপিজি সরকার আমদানি করে না। এটা প্রাইভেট কোম্পানি আনে। এটাকে ঠিক রাখার জন্য আমরা কাজ করছি। দিন-রাত কাজ করছি। সুতরাং দেখা যাক কতদূর কী করা যায়।’

প্রশ্ন উঠছে সংকটের উৎস নিয়ে

পর্যাপ্ত আমদানির পরও বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় কয়েকশ থেকে প্রায় ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রির ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠছে।

আমদানিতে ঘাটতি না থাকার পরও কেন খুচরা বাজারে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না—এ নিয়ে ভোক্তা ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ‘সিলিন্ডার নেই’ বলার পর বাড়তি দাম দিলে সিলিন্ডার ‘ম্যানেজ’ করে দেওয়ার প্রস্তাব কৃত্রিম সংকট কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

বিইআরসি আমদানি ও বিক্রির তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সরকার ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তদারকি জোরদার করায় এখন নজর থাকবে—বাজারে এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক হয় কি না এবং সরকার নির্ধারিত দামে ১২ কেজির সিলিন্ডার সাধারণ ক্রেতারা কিনতে পারেন কি না।

ঢাকার E দোকান

📱 ০ ১ ৬ ১ ২ ৩ ৪ ৬ ১ ১ ৯
```

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *