বিশেষ প্রতিবেদক
বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার পথে হাঁটছে বাংলাদেশ সরকার। মোট ১৯০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ সংগ্রহের পরিকল্পনা থাকলেও এর বড় অংশ—প্রায় ১৬০ কোটি ডলার—নন-কনসেশনাল বা কঠিন শর্তের ঋণ। অর্থাৎ এই ঋণে সুদের হার বেশি, গ্রেস পিরিয়ড কম এবং পরিশোধের সময়সীমাও তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত। ফলে অর্থনীতিতে ভবিষ্যতে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৯৫ পয়সা) মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৩ হাজার ৩৬০ কোটি টাকার বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা না আনলে এ ধরনের ঋণের ওপর নির্ভরতা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকি বাড়াবে।
কোন সংস্থা থেকে কত ঋণ
সরকার ইতোমধ্যে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে কয়েকটি ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী—
- এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ১০৫ কোটি ডলার
- জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) থেকে ৫০ কোটি ডলার
- এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে ২৫ কোটি ডলার
- ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওএফআইডি) থেকে ১০ কোটি ডলার
এসব ঋণের বড় অংশই উচ্চ সুদের আওতায় পড়বে।
কঠিন শর্তের ঋণের চাপ
প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ১৬০ কোটি ডলার পর্যন্ত ঋণে সুদের হার সর্বোচ্চ ৫.০৮ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। যেখানে সহজ শর্তের (কনসেশনাল) ঋণে সাধারণত সুদ ১–১.৫ শতাংশের মধ্যে থাকে এবং পরিশোধের সময়সীমা ২৫ বছর পর্যন্ত হয়, সেখানে এই কঠিন শর্তের ঋণে—
- গ্রেস পিরিয়ড মাত্র ৩ বছর
- মোট পরিশোধকাল প্রায় ১২ বছর
- অনেক ক্ষেত্রে সুদ ৫ শতাংশের বেশি
ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধের চাপ তৈরি হবে।
ঢাকা-সিলেট চার লেন প্রকল্পেও উচ্চ সুদের ঋণ
ঢাকা-সিলেট করিডর উন্নয়ন প্রকল্পের জন্যও চড়া সুদে ঋণ নেওয়া হচ্ছে। এডিবি থেকে প্রায় ৩০ কোটি ডলার ছাড়ের প্রক্রিয়া চলছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা। এর আওতায় প্রায় ২১০ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হবে।
বাজেট সহায়তায় বিভিন্ন ঋণ
বাজেট সহায়তার অংশ হিসেবে—
- এডিবি দেবে ৭৫ কোটি ডলার (এর একটি অংশ উচ্চ সুদে)
- এআইআইবি দেবে ২৫ কোটি ডলার (সুদ প্রায় ৫.০৮%)
- জাইকা দেবে ৫০ কোটি ডলার
- ওএফআইডি দেবে ১০ কোটি ডলার (সুদ প্রায় ৩.৬১%)
এসব অর্থ মূলত চলমান অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা এবং বাজেট সহায়তায় ব্যবহার করা হবে।
ঋণ ছাড় ও পরিশোধ প্রায় সমান
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে—
- বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান এসেছে প্রায় ৩০৫ কোটি ডলার
- একই সময়ে পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ২৯০ কোটি ডলার
অর্থাৎ নতুন ঋণ নেওয়া এবং পুরনো ঋণ শোধ—দুটোর পরিমাণ প্রায় সমান হয়ে যাচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে এবং সরকারি ব্যয়ে নিয়ন্ত্রণ না আনলে এই ঋণ পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প ব্যয়, বিদেশ সফর এবং অপচয় কমানো গেলে উচ্চ সুদের ঋণের প্রয়োজন অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, দেশের বৈদেশিক ঋণের চাপ দ্রুত বাড়ছে এবং আগামী কয়েক বছর তা আরও বৃদ্ধি পাবে। বাজেটের বড় অংশ ঋণ পরিশোধে চলে গেলে উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
গুণগত বাজেটের ওপর জোর
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বড় বাজেটের চেয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী বাজেট এখন বেশি জরুরি। এজন্য—
- বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবসম্মত করা
- প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো
- স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সবমিলিয়ে, উচ্চ সুদের বৈদেশিক ঋণের ওপর বাড়তি নির্ভরতা স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119