নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের বাজারব্যবস্থায় ভয়াবহভাবে বিস্তার লাভ করেছে নকল ও ভেজাল পণ্যের বাণিজ্য। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি কার্যক্রম চললেও বাস্তবে এর লাগাম টানা যাচ্ছে না। বরং অভিযানের পরও অব্যাহত রয়েছে নকল পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণ। খাদ্যপণ্য, ওষুধ, শিশুখাদ্য, প্রসাধনী, পানীয়, বৈদ্যুতিক সামগ্রী থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবহার্য প্রায় সব ধরনের পণ্যেই এখন ভেজাল ও নকলের ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পরিস্থিতি শুধু অর্থনীতির জন্য নয়, দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ধরনের হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানায়, বাজারে বিক্রি হওয়া বহু খাদ্য ও পানীয়তে ক্ষতিকর রাসায়নিক, অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ ও নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব পণ্য গ্রহণের ফলে খাদ্যে বিষক্রিয়া, পেটের জটিলতা, লিভার ও কিডনির সমস্যা, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। অন্যদিকে নকল প্রসাধনীতে পারদ, স্টেরয়েড ও সিসার মতো ক্ষতিকর উপাদান থাকায় ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি, অ্যালার্জি ও দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দুধ, ভোজ্যতেল, মধু, চা, কফি, চকোলেট, সস, কোমল পানীয়, বোতলজাত পানি ও শিশুখাদ্যের মতো বহুল ব্যবহৃত পণ্যগুলো সবচেয়ে বেশি ভেজাল ও নকল হচ্ছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা নামী ব্র্যান্ডের পণ্যের নাম, মোড়ক, রং ও ডিজাইন প্রায় হুবহু নকল করে বাজারজাত করছে। ফলে সাধারণ ক্রেতারা আসল ও নকল পণ্যের পার্থক্য সহজে বুঝতে পারছেন না। কম দামে পণ্য পাওয়ার আশায় অনেক ভোক্তা অজান্তেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্নমানের কাঁচামাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, ডায়রিয়া, সংক্রমণ ও কিডনি জটিলতার ঝুঁকি বাড়ছে। একইসঙ্গে বড়দের মধ্যে বাড়ছে লিভার রোগ, হজমজনিত সমস্যা ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি। দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগের প্রবণতাও বাড়ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। শুধু জনস্বাস্থ্য নয়, নকল ও ভেজাল পণ্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতিও। বৈধ কোম্পানির পণ্য নকল করে বাজারে ছাড়ায় তাদের ব্র্যান্ড সুনাম ও ক্রেতাদের আস্থা কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। কর প্রদানকারী বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে, আর অবৈধ ব্যবসায়ীরা কর ফাঁকি দিয়ে লাভবান হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে এই ঘাটতি লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিভিন্ন খাতে অবৈধ ও রাজস্ববিহীন বাণিজ্য বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারাই এর অন্যতম কারণ। যদিও ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনায় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, জনবল সংকট, পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার সুবিধার অভাব এবং দুর্বল তদারকি ব্যবস্থার কারণে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হচ্ছে না।

এছাড়া রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদনহীন কারখানায় নকল পণ্য উৎপাদনের অভিযোগ রয়েছে। সেখানে জাল বিএসটিআই স্টিকার, ভুয়া হলোগ্রাম ও নকল রেভিনিউ স্ট্যাম্প ব্যবহার করে বাজারে পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। চা, কফি, গুঁড়া দুধ, বোতলজাত পানি, সিগারেট, প্রসাধনী, ওষুধ ও বৈদ্যুতিক পণ্যের মতো বহুল ব্যবহৃত সামগ্রীও এর বাইরে নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে পণ্যের সত্যতা যাচাই সহজ করতে কিউআর কোডভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে নকল ও ভেজাল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তবে বর্তমান আইনের কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৬০ কোটি মানুষ অসুস্থ হয় এবং মারা যায় প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজার মানুষ। বাংলাদেশেও ভেজাল খাদ্যের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে তারা ১২৬টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে প্রায় ৫৬ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছে এবং শতাধিক মামলা দায়ের করেছে। কিন্তু এরপরও বাজারে ভেজাল ও নকল পণ্যের বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) ড. মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, বর্তমান আইনে জরিমানার সর্বনিম্ন পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় অনেক সময় মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। ফলে কিছু ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সতর্কবার্তা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করতে হয়। এছাড়া লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থা ও তদারকি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত বাজার তদারকি জোরদার, আধুনিক পরীক্ষাগার সুবিধা বৃদ্ধি, কঠোর শাস্তি নিশ্চিত এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি বৈধ ব্যবসা ও সরকারের রাজস্ব আহরণও শক্তিশালী হবে।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119