“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

দেশে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ম্যালেরিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে আবারও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ম্যালেরিয়া। দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণে থাকা এই রোগ নতুন করে বিভিন্ন অঞ্চলে সংক্রমণ বাড়াতে শুরু করায় স্বাস্থ্যখাতে সতর্কতা জোরদারের দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ম্যালেরিয়া নির্মূল কার্যক্রমে স্থবিরতা, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, সীমান্তবর্তী চলাচল, বনাঞ্চলকেন্দ্রিক জীবনযাপন এবং পর্যটন বৃদ্ধির কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি আবারও বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারি অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ ও নির্মূল কার্যক্রমে বড় ধরনের ধীরগতি তৈরি হয়েছে। যদিও গ্লোবাল ফান্ডের সহায়তায় কিছু কার্যক্রম চালু রয়েছে, তবে তা পূর্ণাঙ্গভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, বর্তমানে দেশে ম্যালেরিয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ও হালনাগাদ তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি চার বছর অন্তর জাতীয় পর্যায়ে ম্যালেরিয়া জরিপ পরিচালনার কথা থাকলেও গত দুই বছরে কোনো জরিপ হয়নি। এমনকি ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যুর ডেথ রিভিউও সম্পন্ন করা হয়নি। ফলে রোগটির প্রকৃত বিস্তার, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং সংক্রমণের ধরণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ আরো বেড়েছে রাজধানী ঢাকায় অ্যানাফিলিস প্রজাতির মশা শনাক্ত হওয়ায়। এই মশাই মূলত ম্যালেরিয়ার জীবাণু বহন করে। তবে বর্তমানে পাওয়া মশাগুলো জীবাণুবাহী কি না, কিংবা সেগুলো বাইরের কোনো অঞ্চল থেকে এসেছে নাকি স্থানীয়ভাবে বিস্তার লাভ করছে—তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এটি লোকাল ট্রান্সমিশনের ইঙ্গিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

বাংলাদেশে গত এক দশকে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। কীটনাশকযুক্ত মশারি বিতরণ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, কমিউনিটি পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তবর্তী এলাকায় যাতায়াত বৃদ্ধি, পর্যটনের বিস্তার এবং সচেতনতার ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি আবারও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল এখনো দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে স্থানীয়ভাবে ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ বিদ্যমান রয়েছে। এর মধ্যে বান্দরবানের পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। পর্যটন মৌসুমে বহু মানুষ এসব এলাকায় ভ্রমণ করছেন। কিন্তু অনেকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন না করায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ফিরে আসছেন। ফলে শহরাঞ্চলেও ম্যালেরিয়া নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, পার্বত্য অঞ্চল থেকে ফেরত আসা কয়েকজন রোগীর শরীরে ম্যালেরিয়া শনাক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা না করানোর কারণে অনেক ক্ষেত্রে রোগ শনাক্তে দেরি হচ্ছে এবং এতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর দেশের ১৩টি জেলায় মোট ১০ হাজার ১৬২ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন ১৬ জন। যা আগের কয়েক বছরের তুলনায় উদ্বেগজনক বৃদ্ধি হিসেবে দেখা হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৪৬০ জন এবং মারা গেছেন একজন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের শুরুতেই এ ধরনের সংক্রমণ ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা বহন করছে।

সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা পাওয়া গেছে বান্দরবানে। জেলাটিতে গত বছর ৫ হাজার ২৩ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন, যা দেশের মোট আক্রান্তের প্রায় অর্ধেক। এছাড়া রাঙামাটিতে ৩ হাজার ৬১৪ জন, কক্সবাজারে ৮৪৫ জন এবং খাগড়াছড়িতে ৫৩৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান সরকারের ম্যালেরিয়া নির্মূল পরিকল্পনার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে ১৭ হাজার ২২৫ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। পরে ২০২০ ও ২০২১ সালে করোনাভাইরাস মহামারির সময় আক্রান্তের সংখ্যা কমে যথাক্রমে ৬ হাজার ১০৪ এবং ৭ হাজার ২৯৪ জনে নেমে আসে। তবে ২০২২ সাল থেকে আবারও সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। গত বছর আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩ হাজার ১০০ জনে এবং মৃত্যু হয় ৯ জনের। চলতি বছরে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল এবং নির্মূলের লক্ষ্যে কার্যক্রমও এগোচ্ছিল। কিন্তু সেক্টরভিত্তিক কর্মসূচি বাতিল হওয়ায় কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। এর ফলেই আবারও সংক্রমণ ও মৃত্যুহার বাড়ছে। তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রিত কোনো রোগের ক্ষেত্রে উদাসীনতা দেখা দিলে পুনরায় সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়াই স্বাভাবিক। তাই এখনই কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ ও নজরদারি জোরদার না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ম্যালেরিয়া নির্মূলে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নিয়মিত জরিপ পরিচালনা, সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি বাড়ানো, পর্যটকদের সচেতন করা, দ্রুত রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে অ্যানাফিলিস মশার বিস্তার ও প্রকৃতি নিয়ে দ্রুত গবেষণা পরিচালনারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *