“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

চুয়াডাঙ্গায় কোরবানির ঈদ ঘিরে কামারপল্লীতে ব্যস্ততা, কারিগরদের মুখে সাময়িক হাসি

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন কামারপল্লীতে বেড়েছে কর্মব্যস্ততা। কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার কাজে ব্যবহৃত দা, ছুরি, চাপাতি ও বঁটির চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন কামারশিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগররা। কামারশালার চারদিকে ভেসে আসছে ঠুং-ঠাং শব্দ, আর হাপরের বাতাসে জ্বলে উঠছে কয়লার আগুন। সেই আগুনে পোড়া লোহা দক্ষ কারিগরের হাতুড়ির আঘাতে রূপ নিচ্ছে ধারালো দা, ছুরি ও চাপাতিতে। চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কামার পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ ঐতিহ্যবাহী পেশাকে ধরে রেখেছেন। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় কোরবানির ঈদকে ঘিরেই তাদের কাজের চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময়টিই তাদের জন্য সবচেয়ে লাভজনক মৌসুম হিসেবেও পরিচিত। তবে বাড়তি কাজের চাপ থাকলেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রত্যাশিত লাভ পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন অনেক কারিগর।

সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা যায়, কামারশালাগুলোতে পুরোনো দা-ছুরি শান দেওয়া এবং নতুন সরঞ্জাম তৈরির ধুম পড়েছে। অনেকে আগেভাগেই ব্যবহৃত ছুরি ও দা ধার করাতে নিয়ে আসছেন। দোকানের সামনে সারি সারি সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন আকারের ছুরি, চাপাতি, দা ও বঁটি। আকার, ওজন ও মানভেদে প্রতিটি সরঞ্জামের দামও আলাদা। ব্যবসায়ীরা জানান, সাধারণ ছুরি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায়, দা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকায়, বঁটি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় এবং কোরবানির পশু জবাইয়ের বিশেষ ছুরির দাম রাখা হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া কেজি ও মানভেদে দাম নির্ধারণ করা হয়। অনেক কারিগর আবার ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী কাস্টম ডিজাইনের সরঞ্জামও তৈরি করছেন।

“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

কার্পাসডাঙ্গা বাজারের কামার কারিগর জিয়ারুল রহমান বলেন, “লোহা ও কয়লার দাম অনেক বেড়ে গেছে। কাজ বেশি হলেও লাভ তেমন থাকে না। ঈদ সামনে থাকায় এখন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে। এত অর্ডার আসে যে সময়মতো সরবরাহ দিতে হিমশিম খেতে হয়।” আরেক কারিগর আলামিন হোসেন বলেন, “আমাদের পরিশ্রমের তুলনায় আয় খুবই কম। সারাদিন আগুনের পাশে কাজ করতে হয়, এতে শারীরিক সমস্যাও হয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেকেই এখন পৈত্রিক পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যাচ্ছেন।”

কারিগর সুমন আলী বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষরাও এই কাজ করতেন। আমরাও করছি। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই এ পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে। কারণ, কষ্ট বেশি হলেও আয় তুলনামূলক কম।” কারিগরদের ভাষ্য, লোহার পাত, কাঠের হাতল, কয়লা ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে কাজের চাপ বাড়লেও লাভের পরিমাণ কমে গেছে। তারা মনে করেন, সরকারি সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পেলে এই শিল্পকে আরও আধুনিক ও লাভজনক করা সম্ভব।

দামুড়হুদার ডুগডুগি বাজারে নতুন দা ও ছুরি কিনতে আসা শরিফুল ইসলাম বলেন, “কোরবানির ঈদ সামনে, তাই আগে থেকেই প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে এসেছি। তবে আগের তুলনায় দা-ছুরির দাম অনেক বেশি।” অপরদিকে ক্রেতা রাজু অভিযোগ করে বলেন, “ঈদ এলেই দা, চাপাতি ও ছুরির দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এমনকি ছুরি শান দিতেও ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।”

কারিগরদের দাবি, সরকার যদি প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং স্বল্পসুদের ঋণের ব্যবস্থা করত, তাহলে এ শিল্প আরও সম্প্রসারিত হতো এবং উন্নতমানের পণ্য উৎপাদন সম্ভব হতো। তারা মনে করেন, ঐতিহ্যবাহী কামারশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ, প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা জরুরি। আসন্ন ঈদুল আজহা যেমন কামারদের কর্মব্যস্ততা বাড়িয়েছে, তেমনি তাদের মুখে ফিরিয়েছে সাময়িক হাসি। তবে সেই হাসি স্থায়ী করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তবসম্মত সহায়তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Play sound