“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা দাম বাড়ানোর বড় প্রস্তাব, চাপে পড়তে পারেন কোটি গ্রাহক

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের বিদ্যুৎ খাতে বাড়তে থাকা লোকসান, জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে পাইকারি ও খুচরা—দুই পর্যায়েই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বড় ধরনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি। প্রস্তাব অনুযায়ী, আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুতের গড় ইউনিট মূল্য বর্তমান ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৬৫ পয়সা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের গ্রাহকেরা।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আগামী ২০ ও ২১ মে গণশুনানির মাধ্যমে এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করবে। শুনানির পর কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

ভর্তুকি ও লোকসান কমাতেই মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব

বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লার মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের উচ্চ বিনিময় হার, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ এবং ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে।বর্তমানে দেশে মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৯৭ লাখ। এর মধ্যে বিপিডিবির অধীনেই রয়েছে প্রায় ৪৩ লাখ ৮১ হাজার গ্রাহক, যাদের অধিকাংশই আবাসিক। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ বিক্রিতে বিপিডিবির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১১২ কোটি ১০ লাখ টাকা। আগামী অর্থবছরে তা বেড়ে ৩২৮ কোটি ৯০ লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই ঘাটতি কমাতেই খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


নিম্নআয়ের গ্রাহকদের ওপর বাড়তে পারে চাপ

বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য বিভিন্ন স্ল্যাবে বিদ্যুতের আলাদা দাম রয়েছে। সবচেয়ে কম ব্যবহারকারী গ্রাহকরা সাধারণত ০-৫০ ইউনিট ও ০-৭৫ ইউনিট স্ল্যাবের আওতায় থাকেন। এই দুই স্ল্যাবে বর্তমানে ইউনিটপ্রতি মূল্য যথাক্রমে ৪ টাকা ৬৩ পয়সা এবং ৫ টাকা ২৬ পয়সা। তবে নতুন প্রস্তাবে ০ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের একক স্ল্যাবে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এই নতুন স্ল্যাবে ইউনিটপ্রতি দাম ৮ টাকা ৬৫ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন কার্যকর হলে স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ আগে যারা কম ইউনিট ব্যবহারের কারণে তুলনামূলক কম বিল দিতেন, তাদেরও এখন বেশি হারে বিল পরিশোধ করতে হতে পারে। মাসে মাত্র ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী গ্রাহকের বিলও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

উচ্চ ব্যবহারকারীদের বিলও বাড়বে

বিপিডিবির প্রস্তাবনায় উচ্চমাত্রার বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্যও বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী—

  • ২০১-৩০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের বিল বাড়তে পারে প্রায় ২১.৭৪ শতাংশ
  • ৩০১-৪০০ ইউনিটে বৃদ্ধি হতে পারে ২২.৪৫ শতাংশ
  • ৪০১-৬০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে ২৩.২৯ শতাংশ
  • ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীদের বিল বাড়তে পারে প্রায় ২৩.৯৫ শতাংশ

শিল্প, হাসপাতাল ও সেচ খাতেও প্রভাব

শুধু আবাসিক গ্রাহকই নয়, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রভাব পড়তে পারে শিল্প ও সেবা খাতেও। সেচ পাম্প, শিল্পকারখানা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক ভবন, নির্মাণ খাত এবং ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনগুলোর বিদ্যুতের দাম ১৫ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং পরোক্ষভাবে বাজারে নিত্যপণ্যের দামও বাড়তে পারে।


পাইকারি বিদ্যুতের দামও বাড়ানোর পরিকল্পনা

খুচরা পর্যায়ের পাশাপাশি বিদ্যুতের পাইকারি দামও বাড়াতে চায় বিপিডিবি। বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য ৭ টাকা ৪ পয়সা। বিপিডিবির দাবি, এই মূল্য উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম। চলতি অর্থবছরে সংস্থাটির মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৮৩ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি সামাল দিতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ব্যয় আরও বেড়ে ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় বিপিডিবি পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ১২ টাকা ৯১ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে।


পল্লী বিদ্যুতের আলাদা প্রস্তাব

দেশের সবচেয়ে বড় বিতরণ নেটওয়ার্ক পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডও (আরইবি) বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব জমা দিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ গ্রাহক পল্লী বিদ্যুতের আওতায় রয়েছেন। এদের বড় অংশই গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের পরিবার। তবে স্বস্তির বিষয় হচ্ছে, ০-৫০ ইউনিট পর্যন্ত লাইফলাইন গ্রাহকদের বিদ্যমান রেট অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে আরইবি। অর্থাৎ এই শ্রেণির গ্রাহকদের ইউনিটপ্রতি ৪ টাকা ৬৩ পয়সা আগের মতোই থাকতে পারে। তবে কেউ ৫০ ইউনিটের বেশি ব্যবহার করলেই তাকে উচ্চ স্ল্যাবের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।


ডেসকো, ডিপিডিসি ও নেসকোরও দাম বাড়ানোর আবেদন

ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে তাদের লোকসান হয়েছে প্রায় ৫৯৬ কোটি টাকা। ভবিষ্যতে এই ঘাটতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি। এ কারণে ডেসকো খুচরা পর্যায়ে প্রায় ৯.৬৭ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির আবেদন করেছে। যদিও তারা লাইফলাইন গ্রাহকদের বিদ্যমান সুবিধা বহাল রাখার কথা বলেছে। অন্যদিকে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ৬.৯৬ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রিপেইড মিটারে সিকিরিটি চার্জ আরোপের সুপারিশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) তাদের নিট বিলিং রেট ৯ টাকা ১৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা ৮ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)ও খুচরা পর্যায়ে গড়ে ১০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির আবেদন করেছে।


বাড়তি দুশ্চিন্তায় সাধারণ মানুষ

সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস, জ্বালানি তেল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষ এমনিতেই চাপে রয়েছেন। তার ওপর নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক ব্যয়ে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।


বিইআরসি কী বলছে

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য (বিদ্যুৎ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার বলেছেন, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব বর্তমানে পর্যালোচনায় রয়েছে। তিনি জানান, ২০ ও ২১ মে অনুষ্ঠিতব্য গণশুনানিতে বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়া হবে। এরপর সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি আরও বলেন, “বিইআরসি সবসময় জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। নতুন দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর যাতে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Play sound