নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ ও রসুনের বড় একটি অংশ প্রতিবছর সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এবার আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার দিকে জোর দিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে পেঁয়াজ ও রসুন উৎপাদনপ্রবণ এলাকাসহ সারাদেশে ৮ হাজার এয়ার-ফ্লো মেশিন স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৪তম দিনের প্রশ্নোত্তর পর্বে এ তথ্য জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
সংসদে প্রশ্ন তুললেন এমপি
রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আমিনুর রশিদ তার প্রশ্নে বলেন, বর্তমানে দেশে পেঁয়াজের যে পরিমাণ চাহিদা রয়েছে, সেই তুলনায় উৎপাদনও হচ্ছে। কিন্তু সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর ৬ থেকে ৭ লাখ টন পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, যেসব এলাকায় পেঁয়াজ বেশি উৎপাদিত হয়, সেখানে যদি এয়ার-ফ্লো মেশিন ব্যবহার করে মডেল সংরক্ষণাগার তৈরি করা যায়, তাহলে কৃষকরা সহজেই ৬০০ থেকে ৮০০ মণ পর্যন্ত পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারবেন। এতে বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল থাকবে এবং কৃষকরাও ন্যায্যমূল্য পাবেন।
কৃষিমন্ত্রীর জবাব
প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী বলেন, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী প্রশ্ন। তিনি স্বীকার করেন, দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হলেও সংরক্ষণ সমস্যার কারণে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। মন্ত্রী বলেন, বিশেষ করে রাজবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পেঁয়াজের ভালো উৎপাদন হয়। কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় কৃষকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে এয়ার-ফ্লো মেশিনের মাধ্যমে পেঁয়াজ সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে এবং এতে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে।
কী এই এয়ার-ফ্লো মেশিন
এয়ার-ফ্লো মেশিন এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে সংরক্ষণাগারে বাতাস চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে পেঁয়াজ ও রসুন দীর্ঘ সময় ভালো রাখা যায়। এতে অতিরিক্ত আর্দ্রতা কমে, পচন রোধ হয় এবং স্বাভাবিক মান বজায় থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে—
- পেঁয়াজ ও রসুনের পচন কমবে
- দীর্ঘদিন সংরক্ষণ সম্ভব হবে
- বাজারে হঠাৎ সংকট তৈরি হবে না
- কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন
- আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে
নতুন প্রকল্পের আওতায় ৮ হাজার মেশিন
কৃষিমন্ত্রী আরও জানান, কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণের লক্ষ্যে কৃষি বিপণন অধিদফতর একটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটি কৃষি মন্ত্রণালয়ে পর্যালোচনাধীন রয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন পেলে রাদেশের পেঁয়াজ ও রসুন উৎপাদনশীল এলাকাগুলোতে মোট ৮ হাজার এয়ার-ফ্লো মেশিন স্থাপন করা হবে।
রাজবাড়ীতে বিশেষ গুরুত্ব
রাজবাড়ী জেলা দেশের অন্যতম পেঁয়াজ উৎপাদন এলাকা হওয়ায় সেখানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রী জানান, অনুমোদন সাপেক্ষে রাজবাড়ী-২ আসনের পাংশা, বালিয়াকান্দা ও কালুখালি উপজেলায় প্রথম ধাপে ৮০০ থেকে ১ হাজার এয়ার-ফ্লো মেশিন স্থাপন করা হবে। এতে ওই এলাকার কৃষকরা মৌসুম শেষে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে প্রয়োজনমতো বাজারে বিক্রি করতে পারবেন।
কৃষকের লাভ কী হবে
বর্তমানে অনেক কৃষক মৌসুমে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হন, কারণ সংরক্ষণের সুযোগ নেই। ফলে উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হয়।
নতুন সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু হলে—
- কৃষক কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না
- চাহিদা অনুযায়ী পরে বিক্রি করতে পারবেন
- মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে
- কৃষকের আয় বাড়বে
বাজারে প্রভাব পড়বে কীভাবে
প্রতিবছর পেঁয়াজের দাম ওঠানামা দেশের বাজারে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। উৎপাদন বেশি হলেও সংরক্ষণ না থাকায় কিছু সময়ের মধ্যে বাজারে সংকট তৈরি হয়।
যদি এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন হয়, তাহলে—
- পেঁয়াজের মৌসুমি সংকট কমবে
- দাম স্থিতিশীল থাকবে
- ভোক্তারা স্বস্তি পাবেন
- আমদানির চাপ কমবে
সরকারের আশা
কৃষিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের কৃষকরা পেঁয়াজ অপচয় থেকে রক্ষা পাবেন এবং বাংলাদেশ পেঁয়াজ উৎপাদনে আরও স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে।
সারসংক্ষেপ
দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন যথেষ্ট হলেও সংরক্ষণ ঘাটতির কারণে বড় ক্ষতি হয়। সেই সমস্যা সমাধানে ৮ হাজার এয়ার-ফ্লো মেশিন স্থাপন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কৃষক, ভোক্তা ও জাতীয় অর্থনীতি—তিন পক্ষই লাভবান হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119