নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের মাঠ প্রশাসনে সাম্প্রতিক সময়ে একটি নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঘটনা বাড়ছে। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ব্যক্তিগত কথোপকথন বা অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাগুলো এখন আলোচনার কেন্দ্রে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ঘটনার কারণে কর্মকর্তাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে। এতে প্রশাসনে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে কাজের পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, অডিও ফাঁস বা ভিডিও ধারণ করে কর্মকর্তাদের চাপে রাখার প্রবণতা যদি চলতে থাকে, তবে মাঠ পর্যায়ে জনসেবা বিঘ্নিত হবে, সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধাগ্রস্ত হবে এবং দেশের উন্নয়নে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। গত কয়েক বছরে জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে পেশাগত বিষয় নয়, বরং ব্যক্তিগত জীবনকেই বেশি টার্গেট করা হয়েছে। এর প্রভাব এখনো প্রশাসনের ভেতরে দৃশ্যমান বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সম্প্রতি ঝিনাইদহের বিদায়ী জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাসউদকে উদ্দেশ্য করে এক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দেওয়া বক্তব্যের একটি অডিও ক্লিপকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, যাচাই-বাছাই ছাড়াই একপাক্ষিক বক্তব্যকে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তাছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া অডিওটি ছিল এডিট করা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মুল অডিওতে ইউএনওকে একজনের সাথে কথোপকথন চালিয়ে যেতে শোনা যায়, যেখানে বিভিন্নভাবে ইউএনওকে কথার জালে ফাসিয়ে উত্তেজিত করে কিছু বক্তব্য আদায়ের চেষ্ঠা করা হয় এবং পরবর্তীতে এটি এডিট করে ভুল শিরোনামে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে জেলা প্রশাসককে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করা হয় এবং তাকে প্রত্যাহারের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। উল্লেখ্য যে, অডিওতে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর কোনটারই স্থানীয়ভাবে সত্যতা পাওয়া যায় নি।
নিউজ এর অডিও বাকি অংশ
তবে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি মাদক, চোরাচালান ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। তার সময়ে এসব বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অনেকের মতে, এতে অসাধু চক্রের স্বার্থে আঘাত লাগে। অন্যদিকে ওই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হোসনেআরার বিরুদ্ধে কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বে চরম অবহেলার অভিযোগও রয়েছে। অফিস মিটিংয়ে অনুপস্থিতি, নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনে ঘাটতির মতো বিষয় সামনে এসেছে এবং জনসম্মুখে উর্ধতন কর্মকর্তাদের ব্যাপারে ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিমুলক এবং অপেশাদারসুলভ বক্তব্য প্রদান করার তথ্য পাওয়া যায়। এবিষয়ে তাকে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল।
প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনার ক্ষেত্রে মূল অভিযোগ যাচাইয়ের আগেই সামাজিক মাধ্যমে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ শুরু হয়ে যায়। এতে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে অডিও বা ভিডিও সহজেই বিকৃত করা সম্ভব। ফলে কোনো প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের জেরে এ ধরনের উপাদান ছড়িয়ে দিয়ে কাউকে হেয় বা পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি বাড়ছে। মাঠ প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কাজের প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন ও অধস্তনদের মধ্যে অনেক সময় অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়। কিন্তু এখন এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, সাধারণ কথাবার্তাও রেকর্ড করে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হতে পারে।
সাবেক জেলা প্রশাসক ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব রাশিদুল হাসান বলেন, “আস্থার সংকট তৈরি হলে কর্মকর্তারা কেবল রুটিন কাজেই সীমাবদ্ধ থাকেন। নতুন বা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে তারা ভয় পান।” আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, তদন্ত ছাড়া কেবল ভাইরাল তথ্যের ভিত্তিতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অন্যথায় মেধাবী কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে অনাগ্রহী হয়ে পড়তে পারেন।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119