মাসুম বিল্লাহ
বাংলাদেশে মাদকদ্রব্যের বিস্তার নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রাচীনকাল থেকেই মানব সমাজে মাদক ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে এর ভয়াবহতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। দেশে মাদকাসক্তির হার বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক কাঠামোর ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকদ্রব্য মানুষের শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এটি ফুসফুস, শ্বাসযন্ত্র এবং স্নায়ুতন্ত্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। একইসঙ্গে সামাজিক অপরাধ, সহিংসতা এবং কর্মক্ষমতা হ্রাসের মতো সমস্যারও অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দেশের কারাগারগুলোতে থাকা বন্দিদের একটি বড় অংশই মাদক মামলার আসামি—যার হার প্রায় ২৫ শতাংশ। দ্রুত নগরায়ন, কর্মসংস্থানের অভাব এবং সুস্থ বিনোদনের ঘাটতি মাদক বিস্তারে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করা হয়। শহর থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল—সবখানেই এখন মাদক সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। এর প্রধান শিকার হচ্ছে তরুণ সমাজ, যারা কৌতূহল বা বন্ধুমহলের প্রভাবে প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে মাদক গ্রহণ করে, পরে আসক্ত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা জেলা ঝিনাইদহ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই জেলা দীর্ঘকাল ধরেই মাদক চোরাচালানের অন্যতম রুট হিসেবে পরিচিত।
তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই জেলায় মাদকবিরোধী অভিযানে এক অভাবনীয় সাফল্য লক্ষ্য করা গেছে, যার কেন্দ্রে ছিলেন জেলার সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক (ডিসি) জনাব মো. আব্দুল্লাহ আল মাসউদ। তদন্ত ও দাপ্তরিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, তার দায়িত্বকালীন মাত্র চার মাসে মাদক নিয়ন্ত্রণে মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের তৎপরতা আগের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। ঝিনাইদহ জেলার প্রায় ৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যার মধ্যে ১০.৮ কিলোমিটার এলাকা এখনো উন্মুক্ত। সীমান্তবর্তী মহেশপুর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ভারতের সঙ্গে এই উন্মুক্ত সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিলসহ নানা ধরনের মাদক প্রবেশের ঝুঁকি সবসময়ই থাকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ভারতের ভেতরে সীমান্তের কাছাকাছি গড়ে ওঠা মাদক কারখানাগুলো এই জেলা তথা দেশের যুবসমাজের জন্য এক বড় হুমকি।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে কিছু বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করা হলেও, দাপ্তরিক তথ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে। বিদায়ী জেলা প্রশাসক জনাব মাসউদের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বের চার মাস এবং তার দায়িত্বকালীন চার মাসের একটি তুলনামূলক চিত্র হাতে পেয়েছে সরেজমিন বার্তা। দেখা গেছে, তার দায়িত্ব গ্রহণের আগের ৪ মাসে (আগস্ট-নভেম্বর ২০২৫) জেলায় মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছিল মাত্র ৫৭টি। সেখানে জনাব মাসউদের দায়িত্বকালীন ৪ মাসে (ডিসেম্বর ২০২৫-মার্চ ২০২৬) সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫টিতে। অর্থাৎ ৩৮টি অভিযান বেশি পরিচালিত হয়েছে।
এছাড়াও পূর্বের ৪ মাসে মামলার সংখ্যা ছিল ৯৫টি, যা জনাব মাসউদের সময়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৪টিতে। একইভাবে সাজাপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা ৯৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৫৪ জন। আরও দেখা গেছে, মাদক সংক্রান্ত অপরাধে পূর্বের ৪ মাসে যেখানে ১,৫১,২০০ টাকা জরিমানা আদায় হয়েছিল, সেখানে সাবেক ডিসি মাসউদের ৪ মাসে ৩,৭২,৫১০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে। যা পূর্বের তুলনায় ২,২১,৩১০ টাকা বেশি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদায়ী জেলা প্রশাসক এককভাবে নয়, বরং পুলিশ সুপার, বিজিবি, র্যাব এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে সঙ্গে নিয়ে একটি সমন্বিত টাস্কফোর্স হিসেবে কাজ করেছেন এবং উপরোল্লিখিত তথ্য ছাড়াও আরও অনেক অভিযান পরিচালনা করেছেন। মাদক ছাড়াও অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং পরিবেশ দূষণ রোধে তার কঠোর অবস্থান স্বার্থান্বেষী মহলের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অভিযোগ উঠেছে যে, মাদক ব্যবসায়ী ও অবৈধ ভূমি দখলদারদের একটি সিন্ডিকেট মোটা অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে তাকে সামাজিকভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা করছে। একজন ইউএনও-র অডিও সম্পাদনা করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর পেছনেও এই মহলের হাত রয়েছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাদক নিয়ন্ত্রণ শুধু অভিযান বা সরবরাহের পথ (Supply side) বন্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এর জন্য চাহিদাও (Demand side) কমাতে হবে। ঝিনাইদহের সৃজনশীল যুবসমাজকে রক্ষায় খেলাধুলা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। ঝিনাইদহের সাধারণ মানুষ আশা করেন, বর্তমান জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন পূর্বের এই কঠোর অবস্থান এবং সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখবেন, যাতে সীমান্তঘেঁষা এই জনপদকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করা সম্ভব হয়।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119