নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে ইউরিয়া সারের মজুদ। আর সার ইউরিয়াই দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। ওই সারের সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটলে সামগ্রিক কৃষির উৎপাদনেই প্রভাব ফেলে। প্রতি বছর দেশে যে পরিমাণ রাসায়নিক সারের চাহিদা রয়েছে তার প্রায় ৪০ শতাংশই ইউরিয়া। এককভাবে এই সারই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়। সামনেই আমনের মৌসুম। তখন ইউরিয়ার চাহিদা আরো বাড়বে। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন বাড়ানো এবং অন্য উৎস থেকে সার আমদানির দ্রুত উদ্যোগ জরুরি। তা হলে আমন মৌসুমে সংকট বাড়বে এবং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কৃষকরা।

দেশে মৌসুমভেদে চাহিদা মিটিয়েও ন্যূনতম চার থেকে পাঁচ লাখ টন সারের মজুদকে নিরাপদ ধরা হয়। কিন্তু দেশে বর্তমানে ইউরিয়া সারের মজুদ আছে মাত্র ২ লাখ ১৭ হাজার টন। আর আগামী জুন পর্যন্ত ওই সারের ৬ লাখ টনের চাহিদা ও মজুদের প্রাক্কলন রয়েছে। ওই হিসাবে প্রাক্কলিত মজুদ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি দুই-তৃতীয়াংশ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের জেরে বাংলাদেশে সারের এই সংকট তৈরি হয়েছে। কৃষি বিভাগ এবং বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে আগামী অর্থবছরে ২৬ লাখ ২২ হাজার টন ইউরিয়া সারের চাহিদা রয়েছে। আর চাহিদা মিটিয়ে ন্যূনতম চার থেকে ৫ লাখ টনের মজুদকে নিরাপদ ধরা হয়। কিন্তু এ মুহূর্তে ইউরিয়ার মজুদ আছে মাত্র ২ লাখ ১৭ হাজার টন। জুন পর্যন্ত ওই পরিমাণ সারের চাহিদাই রয়েছে। তার মধ্যে উৎপাদন ও আমদানি বাড়াতে না পারলে ফুরিয়ে আসতে পারে মজুদ।
তারপর জুলাই-আগস্টে আমন মৌসুম শুরু হবে। তখন আরো ৬ লাখ ৬৫ হাজার টন ইউরিয়ার চাহিদা রয়েছে। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পুরনো উৎস সৌদি আরব, আরব আমিরাত, চীনের পাশাপাশি ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাইয়ের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে সরকার। তাছাড়া পর্যালোচনা করা হচ্ছে রাশিয়া ও বাহরাইন থেকে পাওয়া প্রস্তাবও। সূত্র জানায়, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) দেশে ইউরিয়া সার আমদানি ও উৎপাদনের কাজটি করে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে ওই সংস্থাটি পরিচালিত হয়। সংস্থাটির অধীনস্থ ৫টি সার কারখানার মধ্যে মাত্র একটি চলছে। চলতি অর্থবছরের শেষ মাস জুনে অন্তত ৪ লাখ টন ইউরিয়া মজুদ রাখা হয়। পাশাপাশি মে ও জুনেও ইউরিয়ার চাহিদা রয়েছে। সেজন্য ওই সময়ের চাহিদা এবং নিরাপদ মজুদ মিলিয়ে জুন পর্যন- অন্তত ছয় লাখ টন ইউরিয়া প্রয়োজন। তাছাড়া সামনে আমন মৌসুমে বড় চাহিদা রয়েছে।
সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত দেশে ইউরিয়ার মজুদে বড় ঘাটতি রয়েছে। তবে আমনের আগে ইউরিয়ার সরবরাহ বাড়াতে আগামী মে মাস থেকে বর্তমানে উৎপাদনে থাকা ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার (জিপিএফ বা জিপি) পিএলসির সঙ্গে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (এসএফসিএল) এবং বহুজাতিক কর্ণফুলি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) চালুর বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ঘোড়াশাল পলাশ কারখানার দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৮০০ টন। শাহজালালের ১ হাজার ৩০০ এবং কাফকোর দুই হাজার টন। ওই তিনটি কারখানা চালু হলে মজুদ সংকট কিছুটা কমে আসবে।
সূত্র আরো জানায়, দেশের সার কারখানাগুলোতে দৈনিক ৩২ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বিপরীতে মাত্র ৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে গ্যাস সংকটে বহুজাতিকসহ ৬টি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে মাত্র একটি উৎপাদনে রয়েছে। অথচ ইউরিয়া সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দেশী কারখানাগুলো চালু রাখা জরুরি। প্রয়োজনে কম গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে হলেও সার কারখানাগুলোতে গ্যাস দিয়ে চালু রাখতে হবে। তাতে আমদানিনির্ভরতা এবং প্রাপ্যতার চিন্ত কমবে। এদিকে এ প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত সম্প্রতি এক সেমিনারে শিল্প সচিব জানান, প্রতি বছর সারের একটা টার্গেট থাকে, আগামী জুন পর্যন্ত ৬ লাখ টন সার স্টক থাকবে। কিন্তু হিসাবে এখন পর্যন্ত আছে মাত্র ২ দশমিক ১৭ লাখ টন। তার মানে চার লাখ টনের ওপরে ঘাটতি আছে। অন্যদিকে এ বিষয়ে বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্যিক, উৎপাদন ও গবেষণা) মো. মনিরুজ্জামান জানান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের চাহিদা অনুযায়ী জুন শেষে দেশে চার লাখ টন মজুদ থাকার কথা।
জুনের পর আমন মৌসুমে চাহিদা রয়েছে সাড়ে ছয় লাখ টন। আমন মৌসুমকে লক্ষ্য রেখে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে তিন লাখ টন ইউরিয়া আমদানির লক্ষ্য রয়েছে। চলতি মাসে দেশ দুটির ৪০ হাজার টন করে ইউরিয়া দেয়ার কথা। যদিও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে সৌদি আরব ও আমিরাত থেকে সার আনা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। সেজন্য বিকল্প উৎস নিয়ে সরকার কাজ করছে। রাশিয়া ও বাহরাইন থেকে প্রস্তাব এসেছে। সেগুলোর পর্যালোচনা চলছে। মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও ব্রুনাইও বিকল্প উৎস হিসেবে রয়েছে।
গার্বিক বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং) মো. খোরশেদ আলম জানান, সরকারিভাবে সাধারণত সারা বছরই চার-পাঁচ লাখ টন মজুদ রাখা হয়। ওই পরিমাণ সারের মজুদকে নিরাপদ ধরা হয়। কিন্তু বিগত পাঁচ-সাত বছর যে পরিমাণ মজুদ থাকে ওই তুলনায় এবার মজুদ নেই। এবার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং যুদ্ধের কারণে পরিবহন বন্ধ থাকায় মজুদ কমেছে। তবে যেটুকু মজুদ আছে তা দিয়ে জুন পর্যন্ত চাহিদা পূরণ করা যাবে।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119