নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে দেশে গণতন্ত্র অর্জিত হয়েছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এখন গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং তা রক্ষা করাই দেশের সবচেয়ে বড় কাজ। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার পাশাপাশি মতপার্থক্য আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নগর ভবন প্রাঙ্গণে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, গণতন্ত্রের জন্য দেশের মানুষ বারবার সংগ্রাম করেছে। বিভিন্ন সময়ে সেই গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় বাধাও এসেছে। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও নানা ত্যাগের পর বর্তমানে যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা কোনোভাবেই অবহেলার কারণে নষ্ট করা যাবে না।
তিনি বলেন, বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তপাতের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর দেশে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির সুযোগ এসেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।

সরকার ও বিরোধী দলের দায়িত্ব
নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠিত হয়েছে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হচ্ছে ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে পুনর্গঠন করা এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা।
তিনি বলেন, গত ১৫-১৬ বছর দেশের ইতিহাসে একটি জটিল সময় অতিক্রম করেছে। ওই সময়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে। এতে অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন এবং অনেকে আহত হয়েছেন। তাদের ত্যাগের বিনিময়ে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির একটি নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, শুধু নির্বাচন আয়োজন করলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। গণতন্ত্রকে কার্যকর ও টেকসই করতে হলে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। সংসদকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে এবং সংসদীয় ব্যবস্থাকে যথাযথভাবে কার্যকর রাখতে হবে।
সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতের পার্থক্য থাকবে। তবে সেই মতপার্থক্য সংঘাতের মাধ্যমে নয়, আলোচনা ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি দল ও বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা। সংসদকে কার্যকর করা এবং বিভিন্ন বিষয়ে যে দ্বিমত রয়েছে, সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করতে হবে।
নতুন লড়াই দেশের পুনর্গঠনের জন্য
আগামী দিনের রাজনৈতিক দায়িত্বের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, অতীতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তারা লড়াই করেছেন। এখন দেশের পুনর্গঠন এবং গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার জন্য নতুন করে কাজ করতে হবে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি, প্রতিষ্ঠান ও সামগ্রিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তুলতে হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে সরকার থাকবে, বিরোধী দলও থাকবে। বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে সবাইকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
সিলেটের মানুষের প্রশংসা
সিলেটের মানুষের প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে একদিকে যেমন অতিথিপরায়ণতা ও শান্তিপ্রিয়তার বৈশিষ্ট্য রয়েছে, অন্যদিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার দীর্ঘ ঐতিহ্যও রয়েছে।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সিলেটের মানুষের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এ অঞ্চলের মানুষ অতীতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
সিলেটের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প
সিলেটের উন্নয়ন প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, এ অঞ্চলের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে স্থানীয় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা কাজ করছেন। এরই মধ্যে সিলেটের উন্নয়নে বেশ কিছু বড় প্রকল্প সামনে এসেছে।
এসব প্রকল্প যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সিলেটের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, নিজেদের অধিকার ও দাবি আদায়ে নিজেদেরই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কেউ এসে সবকিছু করে দিয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা না করে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, “আমরা যদি নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে না পারি, আমরা যদি নিজেদের দাবি নিজেরা আদায় করে নিতে না পারি, কেউ এসে আমাদের জন্য করে দিয়ে যাবে না।”
সিলেটের কৃতী ব্যক্তিদের স্মরণ
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিলেটের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু কৃতী ব্যক্তির অবদানের কথাও স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি।
এ সময় তিনি সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমান, মরমি কবি হাছন রাজা, রাধারমণ দত্ত, সুফি সাধক শাহ আবদুল করিম, হেমাঙ্গ বিশ্বাস এবং লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো গুণী ব্যক্তিদের স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, সিলেটের মাটি যুগে যুগে দেশের রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজজীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বহু গুণী মানুষকে জন্ম দিয়েছে। তাদের কর্ম ও অবদান দেশের মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
অনুষ্ঠানে আরও যারা ছিলেন
সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, জাতীয় সংসদের হুইপ জিকে গউছসহ আরও অনেকে।
বক্তারা সিলেটের উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ এবং জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119