“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

পর্যাপ্ত আমদানির পরও এলপিজির সংকট, ১,৫৮৫ টাকার সিলিন্ডার ২,৯০০ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি স্বাভাবিক থাকার পরও খুচরা বাজারে দেখা দিয়েছে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণ দামে কোথাও কোথাও ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে।

বিইআরসি নির্ধারিত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অথচ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভোক্তাদের কাছ থেকে একই সিলিন্ডারের জন্য ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও আবার সিলিন্ডার নেই বলে দোকান বন্ধ রাখছেন বিক্রেতারা। তবে বেশি দাম দিতে রাজি হলে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে—এমন অভিযোগও করেছেন ভোক্তারা।

খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে এলপিজি আমদানিতে বড় ধরনের কোনো ঘাটতি হয়নি। বরং আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—টানা দুই মাসেই চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণ এলপিজি আমদানি হয়েছে। ফলে আমদানির ঘাটতির কারণে বাজারে এমন সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। এর আগের মাস আগস্টে আমদানি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার টন। এত বিপুল পরিমাণ আমদানির পরও খুচরা বাজারে পণ্য সংকট ও অস্বাভাবিক দাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—কারসাজি হচ্ছে কোথায়?

“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” ✉ Email: dhaka24news.top@gmail.com

নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণ

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার এলপিজি বিক্রেতা ও ভোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারে বর্তমানে ১২ কেজির সিলিন্ডার পেতে অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত দামের তুলনায় অতিরিক্ত ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে।

কলাবাগানের বাসিন্দা মো. আমিনুর বলেন, বাসাবাড়িতে নিয়মিত গ্যাস না থাকায় রান্নার জন্য এলপিজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ করে সিলিন্ডারের দাম এত বেড়ে যাওয়ায় সংসারের খরচ সামলাতে সমস্যা হচ্ছে।

তিনি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দামই বেশি। এর মধ্যে রান্নার গ্যাসের দাম এভাবে বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।

আজিমপুরের বাসিন্দা সোনিয়া পারভীন বলেন, আগে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকার মধ্যে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছেন। এখন একই সিলিন্ডারের জন্য ২ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে।

তার অভিযোগ, দোকানে গেলে অনেক সময় বিক্রেতারা বলেন সিলিন্ডার নেই। কিন্তু বেশি দাম দিতে রাজি হলে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হচ্ছে।

‘আমরাই বেশি দামে কিনছি’

রাজধানীর হাতিরপুল এলাকায় এক খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনিও বেশি দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে বলে দাবি করেছেন।

ওই বিক্রেতার কাছে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম জানতে চাইলে তিনি ২ হাজার ৯০০ টাকা দাবি করেন। কেন এত বেশি দাম—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডিলারদের কাছ থেকেই তাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

তার ভাষ্য, ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনলে অল্প লাভে বিক্রি করতে গেলে ব্যবসা চালানো কঠিন। তাই ২ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি করছেন।

তবে খুচরা পর্যায়ের আরেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, মূল কারসাজি ডিলার পর্যায়েই হচ্ছে। ডিলাররা বেশি দামে পণ্য দেওয়ায় খুচরা বিক্রেতাদের পক্ষেও সরকারি নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি তার।

ধানমন্ডির এক খুচরা ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বেশি দামে পণ্য কিনে কম দামে বিক্রি করলে ব্যবসায় লোকসান হবে। বর্তমানে অনেক সময় সিলিন্ডারই পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে দোকান বন্ধ রেখেও কর্মচারীদের বেতন দিতে হচ্ছে।

আমদানিতে ঘাটতি নেই: বিইআরসি

বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান বলেন, দেশে এলপিজি আমদানিতে ঘাটতি নেই। ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক মাসে দেশে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। এর আগের মাস আগস্টেও আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৫৭ হাজার টন।

তার মতে, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—দুই মাসেই পর্যাপ্ত আমদানি হয়েছে। ফলে বাজারে এলপিজির ঘাটতি থাকার কথা নয়।

তিনি বলেন, প্রতি মাসের ২ তারিখে এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করে বিইআরসি। মূল্য ঘোষণার আগে কিছু ব্যবসায়ী সম্ভাব্য দাম বাড়ার আশঙ্কায় হাতে থাকা পণ্য আটকে রাখতে পারেন। তবে দাম বাড়বে না কমবে—তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি সিপি মূল্য, জাহাজ ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয়ের ওপর এলপিজির দাম নির্ভর করে।

বিইআরসি সদস্য বলেন, মাসের শেষ কয়েক দিন ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা জরুরি। বাজারে সবাই একরকম নয়, তাই কেউ কেউ অনৈতিকভাবে পণ্য আটকে রাখার চেষ্টা করতে পারেন।

বাজার মনিটরিংয়ে জোর

বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি নজরে এসেছে বলে জানিয়েছে বিইআরসি। সংস্থাটির পক্ষ থেকে ভোক্তা পর্যায়ে বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে।

বিইআরসি জানায়, গত মার্চে বাজার মনিটরিংয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। বর্তমানে সেই কমিটিকে আবার সক্রিয় করা হয়েছে। বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করার বিষয়ে কাজ করছে কমিটি।

এ ছাড়া জেলা প্রশাসকদেরও নিজ নিজ এলাকায় বাজার মনিটরিং করার জন্য বলা হয়েছে।

বিইআরসি সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, মূল্য ঘোষণার আগে ব্যবসায়ীদের পণ্য আটকে রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা উচিত নয়। ভোক্তা পর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং নির্ধারিত দাম কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

‘খুচরা বিক্রেতারাই সমস্যা করছেন’

বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) সভাপতি এবং ডেল্টা এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, দেশে এলপিজি আমদানি কমেনি। বর্তমান সংকটের জন্য খুচরা বিক্রেতাদের ভূমিকা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসকদের বাজারে অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছে। কয়েক দিন নিয়মিত অভিযান চালানো হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।

লোয়াব সভাপতি আরও বলেন, কোনো এলপিজি অপারেটর নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছে—এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল হতে পারে।

ক্যাবের প্রশ্ন বিইআরসির ভূমিকা নিয়ে

অন্যদিকে, অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রির ঘটনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম।

তিনি বলেন, ভোক্তাদের কাছ থেকে নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। যারা বিইআরসির নির্ধারিত মূল্য মানছে না, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

তার মতে, শুধু বাজার মনিটরিংয়ের কথা বললে হবে না; অতিরিক্ত দামে বিক্রি, মজুতদারি বা কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

  • আরও পড়ুন

সংকটের আসল কারণ কোথায়?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—যদি আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে দেশে পর্যাপ্ত এলপিজি আমদানি হয়ে থাকে, তাহলে খুচরা বাজারে সিলিন্ডারের এত সংকট কেন?

খাতসংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে মূলত তিনটি বিষয় সামনে এসেছে—ডিলার পর্যায়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ, খুচরা পর্যায়ে সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কায় পণ্য আটকে রাখার অভিযোগ এবং বাজারে কার্যকর তদারকির প্রয়োজনীয়তা।

একদিকে খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা ডিলারদের কাছ থেকেই বেশি দামে সিলিন্ডার কিনছেন। অন্যদিকে আমদানিকারক ও এলপিজি খাতের প্রতিনিধিরা খুচরা পর্যায়কে দায়ী করছেন। আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বলছে, আমদানিতে ঘাটতি না থাকায় বাজারে এমন সংকট হওয়ার কথা নয়।

ফলে নির্ধারিত দামের ১ হাজার ৫৮৫ টাকার সিলিন্ডার কীভাবে ২ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকায় পৌঁছাচ্ছে—এর প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করাই এখন বড় প্রশ্ন।

ভোক্তাদের প্রত্যাশা, বাজার তদারকি জোরদার করে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করা হবে এবং কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত দামের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঢাকার E দোকান

📱 ০ ১ ৬ ১ ২ ৩ ৪ ৬ ১ ১ ৯
```

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *