“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

ভিড়ের আগেই স্বস্তির ঈদযাত্রা, সদরঘাটজুড়ে কড়া নিরাপত্তা

শেষ মুহূর্তে চাপ বাড়ার আশঙ্কা, ১২ লাখ যাত্রীর জন্য প্রস্তুত বিআইডব্লিউটিএ

নিজস্ব প্রতিবেদক

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে শুরু হয়েছে ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রার প্রস্তুতি। তবে এখনো টার্মিনালজুড়ে সেই চিরচেনা উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়নি। দক্ষিণাঞ্চলগামী অধিকাংশ লঞ্চ শনিবার (২৩ মে) সকাল পর্যন্ত ছিল অনেকটাই ফাঁকা। যাত্রীরা স্বস্তিতে টিকিট সংগ্রহ করে নির্বিঘ্নে লঞ্চে উঠতে পারছেন। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই স্বস্তির চিত্র বেশিক্ষণ নাও থাকতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। শেষ কর্মদিবস শেষে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামবে নদীপথে, তখন সদরঘাটে বাড়বে যাত্রীচাপ ও ব্যস্ততা।

“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

শনিবার সকালে সরেজমিনে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, চাঁদপুর ও মুন্সিগঞ্জ রুটের বিভিন্ন টিকিট কাউন্টারে তুলনামূলক কম ভিড় রয়েছে। যাত্রীদের স্বাভাবিক চলাচল থাকলেও ঈদের সময় যে ধরনের অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, তার খুব কম উপস্থিতি চোখে পড়ে। তবে পুরো টার্মিনালজুড়ে ছিল বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থার দৃশ্যমান প্রস্তুতি। বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ সদস্যদের অবস্থান, যাত্রীদের চলাচলে নজরদারি এবং পন্টুন এলাকায় কঠোর পর্যবেক্ষণ চালাতে দেখা গেছে। বিশেষ করে মুন্সিগঞ্জ ও চাঁদপুর রুটের ঘাট এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ছিল বেশি। এই প্রতিবেদক শুক্রবার (২২ মে) রাতেও সদরঘাট ঘুরে দেখেন। তখনও দক্ষিণাঞ্চলগামী বেশিরভাগ লঞ্চে যাত্রী কম ছিল। তবে চাঁদপুর ও মুন্সিগঞ্জ রুটের লঞ্চগুলোতে কিছুটা চাপ দেখা যায়। অনেক যাত্রী পরিবার নিয়ে আগেভাগেই গ্রামের পথে রওনা হয়েছেন, যাতে শেষ মুহূর্তের ভোগান্তি এড়ানো যায়।

লঞ্চ টার্মিনালের প্রধান ফটকে দায়িত্ব পালনরত টিকিট পরিদর্শক আশরাফুল ইসলাম বলেন, “গতকাল রাতেও ভিড় ছিল না। আজ সকাল পর্যন্তও যাত্রীচাপ কম। তবে আগামীকাল থেকে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে রাতের লঞ্চগুলোতে যাত্রী বেশি হবে।”

চাঁদপুর ও মুন্সিগঞ্জ রুটে তুলনামূলক চাপ

সকাল ১০টার দিকে চাঁদপুরগামী ‘স্বর্ণদ্বীপ-৮’ লঞ্চটি যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পরিবার নিয়ে লঞ্চে ওঠার সময় যাত্রী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “ভিড় কম থাকায় স্বস্তিতে যাত্রা করতে পারছি। ঈদের আগে এমন ফাঁকা পরিবেশ সচরাচর দেখা যায় না।”

আরেক যাত্রী নুসরাত জাহান বলেন, “ভেবেছিলাম অনেক ভোগান্তি হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি ভালো। টিকিট পেতেও সমস্যা হয়নি।”

এদিকে ইলিশা-কালীগঞ্জ রুটের ‘ফারহান-৯’ লঞ্চ দুপুরের দিকে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। যাত্রী আব্দুল কাদের বলেন, “এখনো যাত্রী কম। তবে দুপুরের পর ভিড় বাড়তে পারে। ঈদের আগে শেষ দুই-তিন দিনেই সাধারণত সবচেয়ে বেশি চাপ থাকে।”

রুবিনা আক্তার নামে আরেক যাত্রী বলেন, “পরিবার নিয়ে স্বস্তিতে উঠতে পেরেছি। এমন কম চাপ আগে খুব কম দেখেছি।”

ফারহান-৯ লঞ্চের পরিচালক মো. হুমায়ুন কবির বলেন, “এখনো প্রত্যাশিত যাত্রী হয়নি। তবে রাতের ট্রিপগুলোতে চাপ বাড়বে বলে আশা করছি।” অন্যদিকে বরিশালগামী বেশ কয়েকটি লঞ্চ প্রায় ফাঁকাই পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কেবিন ও ডেক—দুই স্থানেই যাত্রীসংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম। যদিও এসব লঞ্চ রাতের দিকে ছাড়বে বলে জানা গেছে।

১২ লাখ যাত্রীর জন্য বিশেষ প্রস্তুতি

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) জানিয়েছে, এবারের ঈদযাত্রায় নদীপথে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ যাত্রী চলাচল করতে পারেন। এই বিশাল চাপ সামাল দিতে প্রায় ১৭৫টি লঞ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নিয়মিত লঞ্চের পাশাপাশি অতিরিক্ত কিছু লঞ্চ বিশেষ সার্ভিস হিসেবে চালানো হবে। বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দর সদরঘাটের নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম-পরিচালক মুহম্মদ মোবারক হোসেন বলেন,
“গত বছরের তুলনায় এবার আরও বেশি প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ২৪ মে’র পর থেকেই যাত্রীচাপ পুরোপুরি বাড়বে বলে ধারণা করছি। যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।” তিনি জানান, ফিটনেসবিহীন কোনো লঞ্চ চলাচল করতে দেওয়া হবে না। প্রতিটি লঞ্চের কাগজপত্র, লাইফ জ্যাকেট, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম পরীক্ষা করা হচ্ছে।

২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা ও নদীতে টহল

ঈদযাত্রা নিরাপদ রাখতে ২১ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত সদরঘাট ও আশপাশের নদীপথে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে। র‌্যাব, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করছে। ঘাট এলাকায় নজরদারির পাশাপাশি নদীতেও টহল জোরদার করা হয়েছে।

মোবারক হোসেন বলেন, “গত ঈদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার নিরাপত্তার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ১ থেকে ২৫ নম্বর পন্টুনের পেছনে কোনো নৌকা প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।” তিনি আরও জানান, সদরঘাট এলাকায় চার থেকে পাঁচটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সার্বক্ষণিক চালু থাকবে। পাশাপাশি মোবাইল টিম ও ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে কাজ করবে।

“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

ফ্রি কুলি, ট্রলি ও হুইলচেয়ার সুবিধা

যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে এবারও বিভিন্ন সেবা চালু রেখেছে বিআইডব্লিউটিএ। প্রতিটি প্রবেশপথে রাখা হয়েছে হুইলচেয়ার। মালামাল বহনের জন্য রয়েছে ট্রলি সুবিধা। এছাড়া বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের সহায়তায় প্রশিক্ষিত ক্যাডেটও নিয়োজিত রয়েছে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কুলিদের হয়রানি বন্ধে। এ বিষয়ে মোবারক হোসেন বলেন, “১০ দিনের জন্য ২০০ জন স্বেচ্ছাসেবী কুলি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা নীল জ্যাকেট পরে দায়িত্ব পালন করছেন। যাত্রীরা বিনামূল্যে তাদের সেবা নিতে পারবেন।”

হকার ও টানাহেঁচড়া বন্ধে কড়াকড়ি

সদরঘাটের পন্টুন এলাকায় যাত্রী টানাটানি, অতিরিক্ত ভিড় ও বিশৃঙ্খলা রোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে কর্তৃপক্ষ। যদিও এখনো কিছু স্থানে হকারদের অবস্থান করতে দেখা গেছে। বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, পন্টুন এলাকা ক্যানভাসার ও হকারমুক্ত রাখতে অভিযান চালানো হবে। কেউ যাত্রীদের জোর করে লঞ্চে তুলতে চাইলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিকল্প ঘাট থেকেও চলবে লঞ্চ

সদরঘাটের ওপর চাপ কমাতে এবারও বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সদরঘাটের পাশাপাশি বছিলা ও কাঞ্চন ব্রিজ এলাকা থেকেও প্রতিদিন অতিরিক্ত চারটি করে লঞ্চ চলাচল করবে। এতে সদরঘাটের যাত্রীচাপ কিছুটা কমবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে কড়াকড়ি

ঈদকে সামনে রেখে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নতুন ভাড়া অনুযায়ী বরিশাল রুটে ডেক শ্রেণির জনপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৯৭ টাকা, ভোলা রুটে ৩৯৮ টাকা, পটুয়াখালীতে ৫০৩ টাকা, ঝালকাঠিতে ৫১৩ টাকা, বরগুনায় ৬৫৮ টাকা এবং চাঁদপুর রুটে ২৮২ টাকা।

আগেভাগেই কেবিন বুকিং

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাস বা ট্রেনের মতো নদীপথে অগ্রিম টিকিট বিক্রির চাপ খুব বেশি দেখা যায় না। নিয়মিত যাত্রীরা সাধারণত পরিচিত লঞ্চ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে আগেই কেবিন বুকিং দিয়ে রাখেন। সদরঘাটের একটি টিকিট কাউন্টারের কর্মী মো. রুবেল মিয়া বলেন, “ঈদের সময় মূল চাপটা পড়ে শেষ দুই-তিন দিনে। তাই অনেকেই আগেই পরিচিত লোকের মাধ্যমে কেবিন ঠিক করে রাখেন।” বরিশালগামী যাত্রী নাজমুল ইসলাম রনি বলেন, “আমরা প্রতিবছর একই লঞ্চে যাই। তাই আগেই কেবিন ঠিক করে রাখি। এতে ঝামেলা কম হয়।”

ঘাটজুড়ে কড়া নজরদারি

পুরো সদরঘাট এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা চোখে পড়ে। টার্মিনালের প্রবেশপথ, পন্টুন এলাকা, টিকিট কাউন্টার ও বিভিন্ন ঘাটজুড়ে পুলিশ সদস্যদের সরব উপস্থিতি ছিল। ঘাট এলাকায় পুলিশ, র‌্যাব ও ফায়ার সার্ভিসের পৃথক কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। এসব কন্ট্রোল রুম থেকে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি যাত্রীদের তথ্যসেবা, জরুরি সহায়তা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ইউনিফর্মধারী সদস্যদের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নজরদারি করছেন। পকেটমার, অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি, টিকিট কালোবাজারি ও অতিরিক্ত যাত্রী ওঠানো ঠেকাতে বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, “ঈদ উপলক্ষে সদরঘাটসহ বিভিন্ন যাতায়াতকেন্দ্রে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপ-কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন জানান, “পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও সদস্য মোতায়েন রয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধেও সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Play sound