“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

করদাতার আস্থা ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন: বাজেট সফল করার মন্ত্র

বিশেষ প্রতিবেদক

সংসদে উপস্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের এই সময়ে বাজেটটি জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার একটি সমন্বিত প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাচ্ছে। সরকারের নেতৃত্বে প্রণীত এই বাজেটে সাধ ও সাধ্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একটি সুস্পষ্ট প্রয়াস লক্ষণীয়।

বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার, সুষম উন্নয়ন এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ার যে রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ধান, চাল, গম, আলু, পিঁয়াজ, তেল, চিনিসহ ৬০টি মৌলিক পণ্যের উৎসে কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাবটি সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এছাড়া দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ইউনিফর্ম, জুতা ও ব্যাগ সরবরাহ এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিকল্পনাও প্রশংসনীয়। তবে বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ২৫-৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় অর্জন করা কঠিন হতে পারে।

রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিলে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর চাপ বাড়বে, যা সামষ্টিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বাজেট বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

বাজেট বাস্তবায়নের তিনটি মূল কৌশল:

১. কর আদায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও মানসিকতার পরিবর্তন:
বাংলাদেশে কর আদায়ের ক্ষেত্রে সক্ষমতার চেয়ে মানসিকতার অভাবই বড় বাধা। কর ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে জনগণের মধ্যে এই বিশ্বাস গড়ে তুলতে হবে যে, তাদের প্রদত্ত কর দেশের উন্নয়নেই ব্যয় হয়। জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় ভূমিকা রাখা জরুরি।

২. দুর্নীতি ও অপচয় রোধে কঠোর ব্যবস্থা:
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বাজেটের একটি বড় অংশ দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে নষ্ট হয়। এই অপচয় বন্ধে কঠোর নজরদারি এবং জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রশাসনের সব স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে করদাতাদের আস্থা বাড়বে।

৩. অর্থ পাচার রোধ ও পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার:
দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে পাচার হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে অর্থ পাচার না হয়, সে জন্য কঠোর নজরদারি ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন অপরিহার্য।

উপসংহার:
সবমিলিয়ে, বাজেটটি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ থাকলেও সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর তদারকি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে তা সফল করা সম্ভব। করদাতার আস্থা অর্জন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলা এবং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার মধ্য দিয়েই এই বাজেট দেশের অর্থনীতিকে একটি ইতিবাচক পথে এগিয়ে নিতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *