“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

আওয়ামী দুঃশাসনের পরের অধ্যায় কী ইসলামী উগ্র মৌলবাদ?

মার্শিয়া মেহনাজ

আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের অবসানের পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে, তা অনেকের কাছে ছিল এক নতুন ভোরের প্রতিশ্রুতি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ার পর সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই আশা জন্মেছিল এবার হয়তো দেশ একটি আরও মুক্ত, গণতান্ত্রিক এবং সহনশীল পথে এগোবে।
কিন্তু আজ একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ক্রমশ সামনে আসছে:
আওয়ামী দুঃশাসনের পর কি আমরা আরেক ধরনের সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?
গত কয়েক সপ্তাহে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ লক্ষ্য করলে দেখা যাচ্ছে কিছু ধর্মভিত্তিক উগ্র গোষ্ঠী (বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ) আবারও নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠছে। এতদিন যেসব সংগঠন প্রান্তিক অবস্থানে ছিল বা আড়ালে কাজ করছিল, তাদের কেউ কেউ এখন প্রকাশ্যে ইসলামী শাসনব্যবস্থার দাবি তুলতে শুরু করেছে।
এই দাবিগুলোকে অনেকেই শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখছেন না; বরং সমাজের চরিত্র বদলে দেওয়ার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখছেন।

বিশেষ করে ভাস্কর্য ও সাংস্কৃতিক প্রতীক নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। কোথাও কোথাও দাবি উঠেছে যে ভাস্কর্য ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়, তাই সেগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। কিন্তু অন্যদিকে অনেকে মনে করেন—এসব ভাস্কর্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ।
নারীর স্বাধীনতা নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের পোশাক, কর্মজীবন বা সামাজিক উপস্থিতি নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য দেখা যাচ্ছে। কিছু গোষ্ঠী ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিত্তিতে নারীদের চলাফেরা ও সামাজিক ভূমিকার উপর সীমাবদ্ধতা আরোপের দাবি তুলছে।

এ ধরনের প্রবণতা অনেকের মধ্যেই আশঙ্কা তৈরি করেছে বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে একটি রক্ষণশীল সামাজিক কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে?
একই সঙ্গে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার দাবিও বিভিন্ন জায়গায় শোনা যাচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধান যেখানে একটি গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলে, সেখানে ধর্মভিত্তিক আইন প্রতিষ্ঠার দাবি নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করছে।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও এই পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি মতাদর্শিক সংঘাতের মঞ্চে পরিণত হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক হতে পারে।

মুক্তচিন্তার মানুষদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। অতীতে বাংলাদেশে লেখক ও ব্লগারদের উপর হামলার ঘটনা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই স্মৃতি এখনো অনেকের মনে তাজা। ফলে যখন সমাজে উগ্র মতাদর্শের উপস্থিতি বাড়তে দেখা যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই অনেকে নিজেদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন।
বাংলাদেশের ইতিহাস কিন্তু অন্য এক বাস্তবতার কথা বলে।

এই দেশ গড়ে উঠেছে ভাষা আন্দোলন, সাংস্কৃতিক সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এই রাষ্ট্রের ভিত্তি ছিল একটি বহুত্ববাদী সমাজের ধারণা যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস থাকবে, কিন্তু সেই সঙ্গে থাকবে সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা।

এই ঐতিহ্যের মধ্যেই বহুদিন ধরে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে এসেছে।
আজ তাই প্রশ্নটি শুধু রাজনৈতিক নয় এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
আমরা কি একটি সহনশীল, বহুত্ববাদী এবং আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যাব?
নাকি ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে নতুন সামাজিক বিভাজনের পথে হাঁটব?

সময়ের সাথে সাথে এই প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার হবে। তবে ইতিহাস আমাদের একটি বিষয় শিখিয়েছে বাংলাদেশের প্রকৃত শক্তি তার বৈচিত্র্য, সহনশীলতা এবং মুক্তচিন্তার ঐতিহ্যে।

সেই ঐতিহ্য রক্ষা করাই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *