নিজস্ব প্রতিবেদক
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির রেশ কাটতে না কাটতেই গ্যাসের দাম বৃদ্ধি—যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। সরকারের এই দ্বিমুখী সিদ্ধান্তে নতুন করে অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে পড়েছে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-আয়ভুক্ত পরিবারগুলো। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের পকেটে টান; সব মিলিয়ে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে।

১. চেইন রিয়েকশন: তেলের দাম বাড়লে বাড়ে সব
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সাথে সাথেই রাজধানীর বাজারগুলোতে এর প্রভাব স্পষ্ট। পরিবহন খরচ বাড়ার অজুহাতে হু হু করে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম।
- ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ: দোলাইপাড়ের মোটর পার্টস বিক্রেতা রুবেলের মতে, জিনিসের দাম বাড়লেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়েনি, ফলে ব্যবসা করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে।
- গৃহিণীদের দুশ্চিন্তা: শ্যামপুর বাজারের ক্রেতা মুসফিকা সুলতানা বলেন, “বাজারে এলেই এখন ভয় লাগে। তেলের দাম বাড়লে সবকিছুর দামই এক লাফে বেড়ে যায়।”
২. নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবন যখন ওষ্ঠাগত
বেসরকারি চাকরিজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুনের মতে, জীবনযাত্রার খরচ বাড়লেও তাদের বেতন বাড়ে না। একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষক রুমানা আক্তার। গ্যাস সিলিন্ডার ও তেলের বাড়তি খরচ মেলাতে গিয়ে তাদের সঞ্চয়ে টান পড়ছে। শিক্ষার্থীরাও ক্ষুব্ধ; বিশ্ববাজারে দাম কমার সময়ে দেশে দাম বাড়ানোকে তারা ‘জনগণের সাথে মশকরা’ বলে অভিহিত করেছেন।
৩. সংকটে কৃষি ও উৎপাদন খাত
কেরানীগঞ্জের কৃষক মো. সাইদুর রহমান জানান, ডিজেলের দাম বাড়লে সেচ ও চাষের খরচ বেড়ে যায়। কিন্তু সেই অনুপাতে ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় আছেন।
৪. চালকদের বাধ্যবাধকতা বনাম যাত্রীদের ভোগান্তি
পরিবহন খাতের চালকরা বলছেন, তেলের দাম বাড়লে মালিকের জমা এবং নিজের খরচ সামলাতে ভাড়া বাড়ানো ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না। রাইদা বাসের চালক জাহাঙ্গীর আলম বা সিএনজি চালক হেলাল উদ্দিন—সবারই একই দাবি, “খরচ না তুললে সংসার চলবে না।” কিন্তু এর চূড়ান্ত মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের।
৫. বিশ্লেষকদের মতে বর্তমান সংকট ও সমাধান
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল মনে করেন:
- বৈদেশিক মুদ্রার চাপ: মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি খরচ হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
- অর্থনৈতিক ঝুঁকি: মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষের সঞ্চয় কমবে, ফলে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট ও বিনিয়োগ মন্দা দেখা দিতে পারে।
- পরামর্শ: কেবল দাম বাড়ানো সমাধান নয়; বরং গণপরিবহনের ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, কঠোর বাজার তদারকি এবং নিম্নবিত্তদের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা এখন সময়ের দাবি।
সারসংক্ষেপ: জ্বালানি খাতের ভর্তুকি কমাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর যে বাড়তি চাপের বোঝা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ও রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে নিম্নবিত্তের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119