বিশেষ প্রতিবেদক
সারাদেশে আবারও বিদ্যুৎ সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের প্রভাবে দেশের ১৮টি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
১. বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও চাহিদার ব্যবধান
দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা চাহিদার চেয়ে বেশি থাকলেও জ্বালানি অভাবে তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
- মোট উৎপাদন সক্ষমতা: ২৯,২৬৯ মেগাওয়াট।
- গড় চাহিদা: ১৫,০০০ মেগাওয়াট।
- গড় উৎপাদন: ১৪,০০০ মেগাওয়াট।
- লোডশেডিং: দৈনিক প্রায় ১,০০০ মেগাওয়াটের বেশি।
- সর্বোচ্চ চাহিদা (২০ এপ্রিল): ১৬,৫০০ মেগাওয়াট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

২. শহর বনাম গ্রাম: বৈষম্যের চিত্র
প্রতিবেদনে দেখা যায়, লোডশেডিংয়ের বড় অংশই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের ওপর।
- গ্রামাঞ্চল: বিভিন্ন জেলায় দিনে-রাতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
- শহরাঞ্চল: ঢাকা বা বড় বিভাগীয় শহরগুলোতে লোডশেডিং তুলনামূলক কম। ১৬ এপ্রিলের তথ্যমতে, মোট ১৪৮২ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের মধ্যে ঢাকার বাইরেই ছিল ১১২২ মেগাওয়াট।
৩. সংকটের মূল কারণ: বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রভাব
বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:
- ভূ-রাজনীতি: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তজনার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হয়েছে।
- আমদানি বাধা: এলএনজি, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানিতে জটিলতা।
- ব্যয়বহুল উৎপাদন: ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়ায় তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে সরকার। এখন কয়লা ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
৪. বন্ধ থাকা ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের তালিকা
জ্বালানি সংকটের কারণে প্রধানত গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো বন্ধ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য কেন্দ্রগুলো হলো:
- ঘোড়াশাল: ইউনিট ৪, ইউনিট ৫, সিসিপিপি ইউনিট ৫ এবং রিজেন্ট (১০৫ মেগাওয়াট)।
- মেঘনাঘাট: ৩৩৫ মেগাওয়াট, সামিট-২ এবং জেরা মেঘনাঘাট।
- আশুগঞ্জ: আশুগঞ্জ টিএসকে (৫০ মেগাওয়াট), ৫৫ মেগাওয়াট ও ১৯৫ মেগাওয়াট।
- অন্যান্য: হরিপুর জিটিপিপি, সিদ্ধিরগঞ্জ ২১০ মেগাওয়াট, চট্টগ্রাম টিপিপি, শিকলবাহা পিকিং জিটি প্রভৃতি।
৫. অঞ্চলভিত্তিক লোডশেডিংয়ের পরিমাণ (মেগাওয়াট)
| অঞ্চল | লোডশেডিং (মেগাওয়াট) |
| ঢাকা | ৩৬০ |
| খুলনা | ৩১৯ |
| কুমিল্লা | ২১০ |
| রাজশাহী | ১৯৫ |
| চট্টগ্রাম | ১২০ |
| বরিশাল | ৯৫ |
| ময়মনসিংহ | ৮০ |
| রংপুর | ৭৮ |
| সিলেট | ২৫ |
৬. জনজীবনে প্রভাব ও সরকারি ভাষ্য
- ভোগান্তি: মেহেরপুর ও রংপুরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রাতে ৪-৫ বার বিদ্যুৎ যাচ্ছে। কৃষি কাজ ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা (বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার্থী) চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
- সরকারি পদক্ষেপ: পিডিবি জানিয়েছে, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে যাতে বড় বিপর্যয় না ঘটে। তবে রাত ৯টার পর দোকানপাট বন্ধ রাখার নিয়ম থাকলেও অনেক জায়গায় তা কার্যকর হচ্ছে না, যা সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
সারসংক্ষেপ: জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম এবং গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কারণে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে কয়লা ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে সংকট কাটানোর আশ্বাস দেওয়া হলেও আপাতত গ্রামাঞ্চলের মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119