ঈদকে কেন্দ্র করে সড়ক-মাঠ দখল, সংঘর্ষের আশঙ্কা; উচ্ছেদে মাঠে সিটি কর্পোরেশন
মোঃ জাকির হোসেন
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকাজুড়ে কোরবানির পশুর হাট জমে উঠতে শুরু করেছে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এবার ২৫টি স্থায়ী ও অস্থায়ী পশুর হাটের অনুমোদন দিলেও এর বাইরে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ পশুর হাট। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় সড়ক, খালি মাঠ, আবাসিক এলাকা ও অলিগলিতে অনুমোদনহীনভাবে এসব হাট বসানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে যেমন নগরজীবনে বাড়ছে ভোগান্তি, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে বাঁশের খুঁটি গেড়ে অস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ, লিফলেট বিতরণ ও প্রচারণা চালানো শুরু হয়েছে। কোথাও কোথাও গরু-ছাগল আনাও শুরু হয়েছে। অথচ এসব হাটের অনেকগুলোর নাম সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদিত তালিকায় নেই। অভিযোগ রয়েছে, লালবাগের শহীদনগর, চন্দ্রিমা মডেল টাউন, নবোদয়, মোহাম্মদিয়া হাউজিং সোসাইটি, সাত মসজিদ হাউজিং জনতার বাজার, মিরপুরের ৬০ ফিট মধ্য পীরবাগ, জিয়া হায়দার সরণি, নটর ডেম কলেজের বিপরীত পাশ, মোহাম্মদপুরের সূচনা কমিউনিটি সেন্টার এলাকা, সোনালী মাঠ ও আগারগাঁওয়ের বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে অবৈধ পশুর হাট গড়ে উঠেছে। এসব স্থানে রাস্তা দখল করে হাট বসানোর কারণে যানজট ও জনদুর্ভোগ বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিবছরের মতো এবারও কিছু অসাধু চক্র ঈদকে কেন্দ্র করে অবৈধভাবে হাট বসিয়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যের চেষ্টা করছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা স্থানীয় ক্ষমতার বলয় ব্যবহার করে তারা প্রশাসনিক নজরদারি এড়িয়ে যাচ্ছে। এদিকে মোহাম্মদপুরের সূচনা কমিউনিটি সেন্টারের সামনে ও পাশের সড়কে ছাগলের হাট বসানোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কে হাট নিয়ন্ত্রণ করবে এবং কারা হাসিল আদায় করবে— তা নিয়ে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয় পরিস্থিতি। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। অবৈধ হাট নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তা জাহেদুল ইসলাম বলেন, “সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদন ছাড়া কোনোভাবেই পশুর হাট বসতে দেওয়া হবে না।

আমাদের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। কোথাও অভিযোগ পেলেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।” তিনি আরও জানান, আগারগাঁও এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা একটি পশুর হাট উচ্ছেদে ইতোমধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। অঞ্চল-৫ এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে হাট উচ্ছেদের পাশাপাশি জড়িত তিনজনকে জরিমানাও করা হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কিছু হাট-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। লালবাগ এলাকার একটি বিতর্কিত হাটের পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত সিরাজুল ইসলাম দাবি করেন, তাদের হাট “বৈধ প্রক্রিয়ার মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে”। যদিও সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদিত তালিকায় ওই হাটের নাম পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, “খাস আদায়ের মাধ্যমে সিটি কর্পোরেশনকে টাকা পরিশোধ করা হবে।” অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, অনুমোদিত হাট ছাড়া কোথাও পশুর কেনাবেচা করতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, “অবৈধভাবে হাট বসিয়ে কেউ বাড়তি সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভ্রাম্যমাণ আদালত যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করবে।”
তিনি আরও জানান, অনিয়ম প্রতিরোধে প্রায় ১০০ জন কর্মকর্তাকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং তারা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি চালাবেন। জানা গেছে, এবার রাজধানীতে ২৩টিসহ সারাদেশে প্রায় ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদিত অস্থায়ী হাট রয়েছে কাজলা ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা, রহমতগঞ্জ ক্লাব মাঠ, শ্যামপুর-কদমতলী ট্রাকস্ট্যান্ড, পোস্তগোলা নদীপাড়, উত্তর শাহজাহানপুর, আমুলিয়া মডেল টাউন, বনশ্রী, জুরাইন, গোলাপবাগসহ বিভিন্ন স্থানে।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদিত হাটগুলোর মধ্যে রয়েছে উত্তরা দিয়াবাড়ি, ভাটুলিয়া, মিরপুর সেকশন-৬, কালশী বালুর মাঠ, খিলক্ষেত, ভাটারা, মেরুল বাড্ডা, মোহাম্মদপুর বছিলা, কাঁচকুড়া ও মস্তুল চেকপোস্টসংলগ্ন এলাকা। দুই সিটি কর্পোরেশন জানিয়েছে, ঈদের দিনসহ মোট পাঁচ দিন এসব অস্থায়ী পশুর হাটে কেনাবেচা চলবে। তবে নগরবাসীর প্রশ্ন— অনুমোদিত হাট থাকার পরও যদি অবৈধ হাট বন্ধ করা না যায়, তাহলে রাজধানীতে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব হবে?
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119