কোরবানির চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পেয়ে বঞ্চিত এতিমখানা, মাদ্রাসা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঈদুল আজহা এলেই কোরবানির পশুর চামড়া ঘিরে আশার আলো দেখেন দেশের হাজারো এতিমখানা, মাদ্রাসা, গরিব মানুষ এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। বছরের এই একটি সময়েই চামড়া বিক্রির অর্থ তাদের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু চলতি বছরও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সরকার কাগজে-কলমে চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করলেও বাস্তব বাজারে তার কোনো কার্যকর প্রতিফলন দেখা যায়নি। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কাঁচা চামড়া বিক্রি হয়েছে অত্যন্ত কম দামে, কোথাও কোথাও ফেলে দিতেও দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়নে কার্যকর নজরদারির অভাব, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য এবং ট্যানারি নির্ভর মূল্য ব্যবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এতিমখানা, মাদ্রাসা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কমে গেছে এতিম শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও ভরণপোষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উৎস।
চামড়া শুধু পণ্য নয়, এতিমদের জীবিকার অন্যতম ভরসা
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই কোরবানির পশুর চামড়া এতিমখানা, মাদ্রাসা এবং বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের অর্থ সংগ্রহের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কোরবানিদাতাদের একটি বড় অংশ পশুর চামড়া এসব প্রতিষ্ঠানে দান করেন। পরবর্তীতে সেই চামড়া বিক্রি করে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে এতিম শিশুদের খাদ্য, শিক্ষা, আবাসন এবং প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ব্যয় নির্বাহ করা হয়। কিন্তু এবার চামড়ার বাজারে দরপতনের কারণে সেই অর্থনৈতিক সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে চামড়ার বাজারে সংকট শুধু একটি শিল্পখাতের সমস্যা নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সমাজের সবচেয়ে অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ওপর।
সরকার নির্ধারণ করল দাম, বাজারে মিলল না প্রতিফলন
চলতি মৌসুমে সরকার ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের মূল্য ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করে, যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই মূল্য বাস্তবায়নের কোনো কার্যকর চিত্র দেখা যায়নি। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি পিস গরুর চামড়া ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম দামে বিক্রি হয়েছে। ছাগলের চামড়ার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। অনেক এলাকায় ব্যবসায়ীরা ছাগলের চামড়া কিনতেই আগ্রহ দেখাননি। ফলে সরকার ঘোষিত মূল্য সাধারণ মানুষের কাছে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

রাজধানীতে পানির দামে বিক্রি হয়েছে চামড়া
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ছোট আকারের গরুর চামড়া ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়, মাঝারি চামড়া ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় এবং বড় চামড়া ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মুগদা এলাকার মৌসুমি ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন বলেন, “দাম কম পাওয়া যায় বলেই কম দামে চামড়া কিনেছি। তারপরও বিক্রি করে লাভ তো দূরের কথা, লোকসান হয়েছে। অনেকেই ফোন দিয়েছিল চামড়া নেওয়ার জন্য, কিন্তু দাম না পাওয়ার আশঙ্কায় আর সংগ্রহ করিনি।” তার মতে, কম দামে চামড়া কিনেও যখন লাভ করা যায় না, তখন এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
চামড়া বিক্রি না হওয়ায় ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে
এবার অনেক স্থানে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। রাজধানীর বিভিন্ন ডাস্টবিন, খোলা স্থান ও নর্দমায় কাঁচা চামড়া পড়ে থাকতে দেখা গেছে। মগবাজারের বাসিন্দা হাসানুর রহমান জানান, তাদের এলাকার অনেক চামড়া সংগ্রহকারীর কাছে ক্রেতা না আসায় চামড়া মাদ্রাসায় দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমার মামার প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার টাকার গরুর চামড়াও কেউ নিতে চায়নি। পরে মাদ্রাসায় দিতে হয়েছে। আবার পুরান ঢাকায় আমার ভাই এক লাখ ৪৩ হাজার টাকার গরুর চামড়া মাত্র ৩০০ টাকায় বিক্রি করেছে।”
সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো
চামড়ার দরপতনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোর ওপর। কারণ এসব প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর কোরবানির মৌসুমে চামড়া সংগ্রহ করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকে। রাজধানীর একটি এতিমখানা ও মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ ফয়জুল্লাহ জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে প্রায় ৮০টি চামড়া সংগ্রহ করেছিল। কিন্তু সব মিলিয়ে বিক্রি করে মাত্র ৩২ হাজার টাকা পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীরা সারাদিন পরিশ্রম করে চামড়া সংগ্রহ করেছে। কিন্তু যে পরিমাণ অর্থ পাওয়ার আশা ছিল, তার অর্ধেকও পাওয়া যায়নি। ফলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে।” সংশ্লিষ্টদের মতে, চামড়ার দাম কমে যাওয়ার অর্থ হলো এতিম শিশুদের খাদ্য, পোশাক ও শিক্ষার জন্য বরাদ্দ অর্থও কমে যাওয়া।
সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কাঁচা চামড়ার বাজার কার্যত নিয়ন্ত্রণ করছে ট্যানারি মালিক ও বড় আড়তদারদের একটি প্রভাবশালী চক্র। তারা বাজারের মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। দীর্ঘদিনের চামড়া ব্যবসায়ী আবুল হাসান বলেন, “২৫-৩০ বছর আগে একটি ভালো মানের গরুর চামড়া ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। এখন একই ধরনের চামড়া ৪০০-৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। এই দামে শ্রমিকের খরচও ওঠে না।” আরেক ব্যবসায়ী প্রশ্ন তুলে বলেন, “চামড়ার জুতা বা চামড়াজাত পণ্যের দাম তো কমেনি। তাহলে কাঁচা চামড়ার দাম এত কম কেন? এখানে নিশ্চয়ই কোনো অসাধু চক্র কাজ করছে।”
ট্যানারি মালিকদের ভিন্ন বক্তব্য
তবে ট্যানারি মালিকদের দাবি, পরিস্থিতি অতটা খারাপ নয়। তাদের মতে, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা থাকলেও সামগ্রিকভাবে চামড়া সংগ্রহ প্রক্রিয়া আগের বছরের তুলনায় ভালো হয়েছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, “প্রতি বছরই কিছু অভিযোগ আসে। তবে এবার গত কয়েক বছরের তুলনায় ব্যবস্থাপনা ভালো হয়েছে। অনেক স্থানে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় চামড়া কেনা হয়েছে। এর সঙ্গে লবণ ও পরিবহন খরচ যোগ করলে সরকার নির্ধারিত মূল্যের কাছাকাছি পড়ে।” তবে মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ী ও মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের অভিজ্ঞতা ট্যানারি মালিকদের এই বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না।
কার্যকর নজরদারির অভাবে বারবার একই সংকট
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সরকার প্রতিবছর মূল্য নির্ধারণ করলেও বাস্তবায়নে দুর্বলতা থাকায় চামড়া খাতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসছে না। বাজার তদারকির ঘাটতি, সংরক্ষণ সুবিধার অভাব এবং ট্যানারিকেন্দ্রিক মূল্য ব্যবস্থার কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো বারবার ক্ষতির মুখে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোরবানির চামড়া দেশের চামড়াশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হওয়া সত্ত্বেও এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে যে খাতটি দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারত, সেটি এখনও নানা সংকটের মধ্যে আটকে আছে।

উপসংহার
কোরবানির পশুর চামড়া ঘিরে প্রতি বছর যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, তার সুফল পাওয়ার কথা ছিল এতিমখানা, মাদ্রাসা, গরিব মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সরকার নির্ধারিত মূল্য কার্যকর না হওয়ায় সেই সম্ভাবনার বড় অংশ হারিয়ে যাচ্ছে। আর এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সমাজের সবচেয়ে অসহায় জনগোষ্ঠী—এতিম শিশু, দরিদ্র পরিবার এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর বাজার তদারকি, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এবং সরাসরি সংগ্রহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119