“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

অদৃশ্য রোবটের আক্রমণ

বিশেষ প্রতিনিধি:

আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশে অর্থনৈতিক মন্দা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টানাপোড়েনকেও ছাড়িয়ে গেছে এক অদৃশ্য অথচ অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকট। এই সংকট আর কেউ নয়—সোশ্যাল মিডিয়ার ‘বটবাহিনী’। গত এক দশকে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতার কারণে দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। কিন্তু এই সুযোগে ডিজিটাল জগৎ এখন রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, কৃত্রিম জনমত তৈরি, বাণিজ্যিক আধিপত্য এবং পরিকল্পিত চরিত্রহননের এক নোংরা কুরুক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ একটি উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করে জানান, দেশের সাইবার জগতের মোট ট্রাফিকের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই মূলত বট বা কৃত্রিম কার্যকলাপ! অর্থাৎ, সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা যে বিপুল মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া দেখি, তার সিংহভাগই প্রকৃত মানুষের (অর্গানিক) নয়।

বটবাহিনী আসলে কী এবং কীভাবে কাজ করে?

‘বট’ শব্দটি এসেছে মূলত ‘রোবট’ থেকে। এটি এমন এক ধরনের সফটওয়্যার প্রোগ্রাম বা অ্যালগরিদম, যা ইন্টারনেটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের মতো আচরণ করতে পারে। যখন কোনো সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কয়েক হাজার বা লাখ লাখ ভুয়া প্রোফাইলকে একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়, তখন তাকে বলা হয় ‘বট আর্মি’।

ডিজিটাল জগতের এই অপশক্তি মূলত দুই ভাগে বিভক্ত:

  • অটোমেটেড বা স্বয়ংক্রিয় বট: এগুলো সম্পূর্ণ কম্পিউটার প্রোগ্রাম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। নির্দিষ্ট কিছু ‘কি-ওয়ার্ড’ (Keyword) নির্ধারণ করে দিলে এরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) যুক্ত আধুনিক বটগুলো আরও বিপজ্জনক, কারণ এরা কপি-পেস্ট না করে মানুষের মতোই প্রাসঙ্গিক ও ভিন্ন ভিন্ন মন্তব্য তৈরি করতে সক্ষম।
  • হিউম্যান ট্রল আর্মি: এরা সরাসরি রক্তমাংসের মানুষ, যারা মোটা অঙ্কের টাকা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভুয়া আইডি ব্যবহার করে কাজ করে। একেকজন মানুষ ১০ থেকে ২০টি ভুয়া আইডি নিয়ন্ত্রণ করে নির্দেশ পাওয়ামাত্রই নির্দিষ্ট কোনো লিংকে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
  • আরও পড়ুন

বটবাহিনীর প্রধান তিনটি আক্রমণ কৌশল

এই কৃত্রিম বাহিনী মূলত তিনটি প্রধান কৌশলে সাইবার দুনিয়াকে বিষাক্ত করে তুলছে:

১. জনমতের দিক পরিবর্তন: কোনো সংবেদনশীল ঘটনা ঘটার পর মুহূর্তের মধ্যে শত শত কৃত্রিম মন্তব্য করে এরা সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনাকে ভুল পথে চালিত করে। ২. চরিত্রহনন ও কুৎসা রটনা: কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্মানহানি করতে এদের লেলিয়ে দেওয়া হয়। হাজার হাজার ভুয়া আইডি থেকে একই ভাষার গালি বা অপবাদ দেখে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে সেটাকেই সত্য বলে ধরে নেয়। বিশেষ করে নারীদের অবমাননা ও হেনস্তা করে তাদের জীবন বিপন্ন করে তুলছে এই চক্র। ৩. কোঅর্ডিনেটেড ইনঅথেনটিক বিহেভিয়ার (CIB): একে মেটা বা ফেসবুকের ভাষায় ‘সংঘবদ্ধ ভুয়া আচরণ’ বলা হয়। কোনো পেজ বা আইডি বন্ধ করার জন্য এরা একসঙ্গে হাজার হাজার ‘রিপোর্ট’ মারে, যার ফলে ফেসবুকের অ্যালগরিদম বিভ্রান্ত হয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই আইডিটি ব্লক করে দেয়।

পেশাদার উপায়ে বট শনাক্ত করার সহজ লক্ষণ

কিছু অস্বাভাবিক আচরণ দেখে সহজেই এই বট বা ভুয়া আইডিগুলো চেনা সম্ভব:

  • অস্বাভাবিক গতি: কোনো নিউজ বা পোস্ট পাবলিশ হওয়ার মাত্র ৫ সেকেন্ডের মধ্যে যদি ১০০ বা তার বেশি কমেন্ট চলে আসে, তবে নিশ্চিতভাবেই সেটি বটের কাজ। মানুষের পক্ষে এত দ্রুত পড়ে কমেন্ট করা অসম্ভব।
  • হুবহু একই কমেন্ট: যদি দেখা যায় ১০-১৫ জন আলাদা মানুষের আইডির কমেন্ট একদম একই, তবে সেটি বটের কারসাজি।
  • অসার প্রোফাইল: এসব আইডির প্রোফাইল পিকচারে থাকে কোনো সেলিব্রিটি, ফুল বা পাখির ছবি। টাইমলাইনে নিজস্ব কোনো পোস্ট থাকে না, কেবল অন্যের পোস্ট শেয়ার করা থাকে এবং তাদের ফ্রেন্ডলিস্টে চরম অস্বাভাবিকতা দেখা যায়।

রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য কেন এটি বড় হুমকি?

বাস্তবে এই কৃত্রিম ঢেউ মানুষের মনস্তত্ত্বকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ব্যান্ডwagon ইফেক্ট’ (Bandwagon Effect) এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের ভাষায় এর নাম ‘অ্যাস্ট্রোটার্ফিং’ (Astroturfing); অর্থাৎ কৃত্রিম উপায়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি করা, যাতে মনে হয় এটিই স্বতঃস্ফূর্ত জনমত।

এই ডিজিটাল প্রতারণা এতটাই ভয়াবহ যে, সরকারের ভালো সিদ্ধান্তকে বিতর্কিত করার পাশাপাশি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাঠপর্যায়ে ‘মব’ বা গণপিটুনির পরিস্থিতি তৈরি করার আগে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে আক্রমণযোগ্য করে তোলার কাজটিও এই বট দিয়ে সম্পন্ন করা হয়। আমাদের সমাজে ‘ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি’ বা তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি দুর্বল হওয়ায় এই নোংরা কৌশল ব্যাপকভাবে সফল হচ্ছে; যেখানে প্রথমে ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির মাধ্যমে ভুয়া কনটেন্ট তৈরি করা হয় এবং পরে সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য করতে বটবাহিনী লেলিয়ে দেওয়া হয়।

“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

উত্তরণের উপায়: কী করা জরুরি?

কৃত্রিম জনমত তৈরির এই ডিজিটাল সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পেতে এখনই তিনটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

  • প্রযুক্তি জায়ান্টদের জবাবদিহিতা: মেটা (ফেসবুক), গুগলসহ বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে বাংলা ভাষা ও আমাদের স্থানীয় সামাজিক বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশকে এখনই এই প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করতে হবে এবং তারা যেন বাংলাদেশে স্থানীয় অফিস স্থাপন করে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
  • কঠোর ও কার্যকর আইন: সংঘবদ্ধ ডিজিটাল অপপ্রচার, ভুয়া তথ্য ছড়ানো এবং ট্রল ফার্মের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ও সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি: স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচি থেকেই শিক্ষার্থীদের তথ্য যাচাই (Fact-check), সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণের শিক্ষা দিতে হবে।

উপসংহার: সরকারকে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে—এই দেশে কি জনগণের অবাধ ও সত্য তথ্যের প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে, নাকি রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তির নিরাপত্তা এই অদৃশ্য বটবাহিনীর কাছে চিরতরে জিম্মি হয়ে থাকবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *