মোঃ সামিরুল ইসলাম
নড়াইল প্রতিনিধি
গ্রামবাংলার শিশিরভেজা ভোরের স্নিগ্ধতা একসময় পূর্ণতা পেত আমাদের জাতীয় পাখি দোয়েলের সুমধুর কলতানে। রূপসী বাংলার আনাচে-কানাচে, বাঁশঝাড়, সজনে কিংবা নারকেল গাছের ডালে একসময় এই পাখির অবাধ বিচরণ থাকলেও আজ তা ক্রমেই এক বিরল স্মৃতিতে পরিণত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) তালিকায় দোয়েল বৈশ্বিক ও দেশীয়ভাবে ‘ন্যূনতম বিপজ্জনক’ প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত হলেও বাস্তবে বাংলাদেশে এর সংখ্যা উদ্বেগজনকহারে কমছে।
সাধারণত ১৫ বছর আয়ুষ্কাল পাওয়া এই পাখিটি এপ্রিল থেকে জুলাই প্রজনন মৌসুমে ৩ থেকে ৫টি ডিম পাড়ে। কিন্তু আজ এদের স্বাভাবিক জীবনচক্র চরম হুমকির মুখে। একসময় যে পাখি বাড়ির উঠোনে কিংবা লাউ-শিমের মাচায় নেচে বেড়াত, তাকে আজ কেবল সরকারি দুই টাকার নোটে আর শিশুদের বর্ণপরিচয়ের বইয়ের পাতাতেই বেশি দেখা যায়। প্রকৃতির এই অকৃত্রিম উপহারকে হারিয়ে ফেলার পেছনে আমরা যে অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিচ্ছি, তা আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব ও পরিচয়ের জন্য এক মর্মস্পর্শী হুমকি।
জাতীয় পাখি দোয়েলের এই বিপন্নতার পেছনে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে মানবসৃষ্ট পরিবেশগত বিপর্যয় ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ। জনসংখ্যার চাপ ও নদীভাঙনের ফলে কৃষিজমি ও বনাঞ্চল উজাড় করে প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে বসতি। ফলে দোয়েলের বাসা বাঁধার প্রধান আশ্রয়স্থল পুরোনো বট-আশ্বত্থ গাছ ও গ্রামীণ ঝোপঝাড় দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি কৃষিজমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশক ও সারের যথেচ্ছ ব্যবহার এদের অস্তিত্বের মূলে সরাসরি কুঠারাঘাত করছে। দোয়েল মূলত কীটপতঙ্গভোজী পাখি।
তাই কীটনাশকের বিষাক্ত প্রভাবে এদের খাদ্যতালিকায় থাকা পোকামাকড় ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি পাখিগুলোও খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মারাত্মক বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছে। গত দুই দশকে দেশের গ্রামীণ সবুজ বেষ্টনীর বিপুল অংশ উজাড় হওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব এদের প্রজননকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে আমরা যে দূষিত পরিবেশ গড়ে তুলছি, তাতে দোয়েলের মতো সংবেদনশীল পাখির প্রাকৃতিক উপায়ে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আবাসস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি দোয়েলকে খাঁচাবন্দি করে পোষার প্রবণতা ও বেআইনি শিকার এদের সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করছে। দেশে প্রচলিত ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২’ অনুযায়ী দোয়েল শিকার বা পাচার সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ।
তা সত্ত্বেও একশ্রেণীর অসাধু চক্র অতিরিক্ত মুনাফার আশায় বনে বা লোকালয়ে ফাঁদ পেতে এই সুকণ্ঠী পাখি ধরে অবৈধভাবে বিক্রি করছে। বন বিভাগের নজরদারির অভাবে শিকারিদের এই দৌরাত্ম্য এখনো থামেনি। আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং দেশব্যাপী সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া জাতীয় সম্পদ ধ্বংসের এই বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব নয়।
- আরও পড়ুন
- স্বামীকে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ, স্ত্রীসহ গ্রেফতার-২

- “বিলুপ্তির পথে জাতীয় পাখি দোয়েল”

- বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্কোয়াশ ২০২৬ এর জমকালো সমাপনী

- ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ বাদ দিয়ে কাশ্মীর দখলে স্লোগান দেওয়া উচিত: শুভেন্দু

- গলাচিপা প্রেসক্লাবের নতুন সভাপতি শংকর লাল দাশ, সম্পাদক সাকিব হাসান

- সিনেমায় যা ছিল কল্পনা, নেপালে কি সেটাই বাস্তব? ‘2012’-এর দৃশ্য নিয়ে তুমুল চর্চা

জাতীয় পাখি দোয়েলকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে কেবল আক্ষেপ নয়, প্রয়োজন সম্মিলিত ও কার্যকর উদ্যোগ। শহর ও গ্রামের পতিত জমিতে দেশীয় প্রজাতির ফলদ ও বনজ গাছ রোপণের মাধ্যমে পাখিদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও নিরাপদ আবাস গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পক্ষীকুল সংরক্ষণের জন্য শিকারমুক্ত নিরাপদ অভয়াশ্রম তৈরি করতে হবে।
দোয়েল কেবল একটি পাখি নয়, এটি আমাদের জাতীয় পরিচয় ও অনাবিল শান্তির প্রতীক। একে শুধু পাঠ্যবই বা কাগজের মুদ্রায় আবদ্ধ না রেখে বাংলার উন্মুক্ত প্রকৃতিতে স্বাধীনভাবে ডানা মেলার সুযোগ করে দেওয়ার মাঝেই আমাদের পরিবেশগত সার্থকতা নিহিত।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119