করীনা-ঐশ্বর্যা-শ্রদ্ধাসহ একাধিক তারকার নাম, পরে যাঁরা হয়ে উঠেছেন স্মরণীয় চরিত্রের মুখ
বিনোদন ডেস্ক
বলিউডে একটি সিনেমার নেপথ্যে নায়িকা নির্বাচন থেকে শুরু করে শুটিং—সবকিছুই অনেক সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয় না। কখনও শুটিং শুরু করার পরও অভিনেত্রী বদল করতে হয়েছে, কখনও পারিশ্রমিক বা সৃজনশীল মতপার্থক্য সামনে এসেছে, আবার কখনও ব্যক্তিগত ব্যস্ততা কিংবা শারীরিক অসুস্থতার কারণে কোনো অভিনেত্রীকে ছবি থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে।
এমন ঘটনাও রয়েছে, যেখানে একজন অভিনেত্রীকে নিয়ে শুটিং শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিতে দেখা গেছে অন্য কাউকে। মজার বিষয় হলো, পরে যাঁরা সেই চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তাঁদের অনেকের ক্যারিয়ারেই ওই ছবি হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
বলিউডের এমনই ১৫টি আলোচিত ছবির গল্প তুলে ধরা হলো—

১. ‘চলতে চলতে’—ঐশ্বর্যার বদলে রানি
শাহরুখ খানের বিপরীতে ‘চলতে চলতে’ ছবিতে প্রথমে অভিনয় করার কথা ছিল ঐশ্বর্যা রায় বচ্চনের। এমনকি ছবির শুটিংও শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু পরবর্তীতে ছবিতে তাঁর জায়গায় নেওয়া হয় রানি মুখোপাধ্যায়কে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, সে সময় শুটিং সেটে ঐশ্বর্যার তৎকালীন প্রেমিক সালমান খানের উপস্থিতি ও কিছু ঘটনার কারণে শুটিংয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে শেষ পর্যন্ত ঐশ্বর্যার পরিবর্তে রানিকে নেওয়া হয়। মুক্তির পর শাহরুখ-রানি জুটি দর্শকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

২. ‘হিরোইন’—ঐশ্বর্যার জায়গায় করীনা
মধুর ভাণ্ডারকরের ‘হিরোইন’ ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘মাহি অরোরা’র জন্য প্রথমে নির্বাচিত হয়েছিলেন ঐশ্বর্যা রায় বচ্চন। ছবির কাজও এগিয়েছিল।
তবে ঐশ্বর্যার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসার পর ছবির শুটিং বন্ধ রাখতে হয়। পরবর্তীতে তাঁর পরিবর্তে করীনা কপূর খানকে নেওয়া হয়। করীনা চরিত্রটিতে অভিনয় করে প্রশংসা পান।

৩. ‘কহো না পেয়ার হ্যায়’—করীনার বদলে অমীষা
হৃতিক রোশনের অভিষেক ছবি ‘কহো না পেয়ার হ্যায়’ আজও বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় রোমান্টিক সিনেমা। তবে এই ছবিতে হৃতিকের বিপরীতে প্রথমে করীনা কপূরের অভিনয় করার কথা ছিল।
করীনা কয়েক দিন শুটিংও করেছিলেন বলে জানা যায়। পরে সৃজনশীল মতপার্থক্যের কারণে তিনি ছবিটি ছেড়ে দেন। এ ক্ষেত্রে করীনার মা ববিতা কপূরের মতামতও প্রভাব ফেলেছিল বলে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত অমীষা পটেলকে নেওয়া হয়। মুক্তির পর হৃতিক-অমীষা জুটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

৪. ‘তনু ওয়েডস মনু’—নীতু চন্দ্রের জায়গায় কঙ্গনা
আর মাধবন ও কঙ্গনা রনৌতের জুটি ‘তনু ওয়েডস মনু’ ছবিতে দর্শকের মন জয় করে নেয়। তবে তনুর চরিত্রে প্রথমে অভিনয় করার কথা ছিল অভিনেত্রী নীতু চন্দ্রের।
নীতু নিজেই বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন, ছবিটিতে কাজ করার বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল। পরে মাধবনের পরামর্শে কঙ্গনা রনৌতকে নেওয়া হয়। কঙ্গনা-মাধবনের জুটি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে ছবিটির দ্বিতীয় কিস্তিও নির্মিত হয়।

৫. ‘লাভ স্টোরি ২০৫০’—করীনার বদলে প্রিয়ঙ্কা
হরমন বাওয়েজার বিপরীতে ‘লাভ স্টোরি ২০৫০’ ছবির নায়িকা হিসেবে প্রথমে ছিলেন করীনা কপূর। এমনকি তিনি ছবির একটি পূর্ণ শিডিউলের শুটিংও করেছিলেন বলে জানা যায়।
পরে সময় দিতে না পারার কারণ দেখিয়ে করীনা ছবিটি থেকে সরে দাঁড়ান বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সেই সময় অন্য একটি ছবির কাজ নিয়েও তাঁর ব্যস্ততা ছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত করীনার জায়গায় প্রিয়ঙ্কা চোপড়াকে নেওয়া হয়।

৬. ‘গোলিয়োঁ কি রাসলীলা রাম-লীলা’—করীনার বদলে দীপিকা
সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর ‘গোলিয়োঁ কি রাসলীলা রাম-লীলা’ ছবির জন্য করীনা কপূর লুক টেস্ট দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ছবিটি করেননি।
পারিশ্রমিক ও শুটিংয়ের তারিখ নিয়ে মতপার্থক্যের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। করীনা সরে যাওয়ার পর চরিত্রটিতে অভিনয় করেন দীপিকা পাড়ুকোন।
রণবীর সিং ও দীপিকার জুটি পরবর্তীতে দর্শকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ছবিটিও তাঁদের ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

৭. ‘মঙ্গল পাণ্ডে: দ্য রাইজিং’—ঐশ্বর্যার বদলে অমীষা
আমির খান অভিনীত ঐতিহাসিক ছবি ‘মঙ্গল পাণ্ডে: দ্য রাইজিং’-এ জ্বালা চরিত্রে অভিনয় করেন অমীষা পটেল। তবে এই চরিত্রের জন্য প্রথমে ঐশ্বর্যা রায় বচ্চনকে নেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।
পারিশ্রমিক নিয়ে পরবর্তীতে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। ঐশ্বর্যার সহযোগী দলের সঙ্গে নির্মাতাদের কিছু বিষয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছিল বলেও খবর প্রকাশিত হয়। শেষ পর্যন্ত চরিত্রটিতে দেখা যায় অমীষাকে।

৮. ‘ফিতুর’—রেখার বদলে তব্বু
অভিষেক কপূর পরিচালিত ‘ফিতুর’ ছবিতে বেগম হজরত চরিত্রে প্রথমে অভিনয় করছিলেন রেখা। কয়েকটি দৃশ্যের শুটিংও করেছিলেন তিনি।
কিন্তু পরে সৃজনশীল মতপার্থক্যের কারণে রেখা ছবিটি থেকে সরে যান বলে জানা যায়। তাঁর পরিবর্তে তব্বুকে নেওয়া হয়। অল্প সময়ের মধ্যে চরিত্রটির জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার কারণে তব্বুর প্রশংসাও করেছিলেন পরিচালক।

৯. ‘সাইনা’—শ্রদ্ধার জায়গায় পরিণীতি
ব্যাডমিন্টন তারকা সাইনা নেহওয়ালের জীবন অবলম্বনে নির্মিত ‘সাইনা’ ছবিতে প্রথমে অভিনয় করার কথা ছিল শ্রদ্ধা কপূরের।
শুটিং শুরুর আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় শ্রদ্ধার শারীরিক সক্ষমতায় প্রভাব পড়ে। চরিত্রটির জন্য প্রয়োজনীয় কঠোর প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাওয়া তাঁর জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। শুটিংয়ের তারিখও কয়েকবার পরিবর্তন করতে হয়।
পরবর্তীতে শ্রদ্ধা ছবিটি থেকে সরে দাঁড়ালে তাঁর জায়গায় পরিণীতি চোপড়াকে নেওয়া হয়। পরিণীতিই শেষ পর্যন্ত সাইনা নেহওয়ালের চরিত্রে অভিনয় করেন।

১০. ‘কোম্পানি’—রিঙ্কি খন্নার বদলে মনীষা কৈরালা
রাম গোপাল ভার্মার ২০০২ সালের আলোচিত ছবি ‘কোম্পানি’তে গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্রে অভিনয় করেন মনীষা কৈরালা।
তবে পরে জানা যায়, চরিত্রটির জন্য প্রথমে রিঙ্কি খন্নাকে নেওয়ার কথা ছিল। এমনকি শুটিং চলাকালীন তাঁকে সরিয়ে মনীষা কৈরালাকে নেওয়া হয়েছিল বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

১১. ‘দিল ধড়কনে দো’—নিকী ওয়ালিয়ার বদলে শেফালী শাহ
জোয়া আখতারের ‘দিল ধড়কনে দো’ ছিল তারকাবহুল সিনেমা। ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র নীলম মেহরার ভূমিকায় দেখা যায় শেফালী শাহকে।
তবে প্রথমে এই চরিত্রের জন্য নিকী ওয়ালিয়ার নাম বিবেচনা করা হয়েছিল। শুটিং শুরুর কয়েক দিন আগে পরিচালক জোয়া আখতার শেফালী শাহকে চরিত্রটির জন্য নির্বাচন করেন বলে জানা যায়। পরে অনিল কপূরের বিপরীতে শেফালীর অভিনয় দর্শকের প্রশংসা পায়।

১২. ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’—উপাসনা সিংহের বদলে ভাগ্যশ্রী
সালমান খানের ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছবি ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’। এই ছবিতে প্রেম চরিত্রে ভাগ্যশ্রী অভিনয় করে রাতারাতি দর্শকের প্রিয় হয়ে ওঠেন।
তবে প্রথমে এই চরিত্রের জন্য উপাসনা সিংহকে নির্বাচিত করা হয়েছিল। উপাসনা নিজেই পরে জানিয়েছিলেন, সালমানের সঙ্গে তাঁর উচ্চতার পার্থক্যের কারণে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়।
এরপর ভাগ্যশ্রীকে নেওয়া হয়। মুক্তির পর সালমান-ভাগ্যশ্রী জুটি বলিউডে বিশেষ জায়গা করে নেয়।

১৩. ‘নমকীন’—রেখার বদলে শর্মিলা ঠাকুর
গুলজারের ‘নমকীন’ ছবির নিমকি চরিত্রের জন্য প্রথমে রেখার কথা ভাবা হয়েছিল। এমনকি তিনি শুটিংও করেছিলেন বলে জানা যায়।
কিন্তু পরে সেই চরিত্রে অভিনয় করেন শর্মিলা ঠাকুর। রেখা কেন ছবি থেকে সরে গিয়েছিলেন, তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে।

১৪. ‘দেবদাস’—করীনার বদলে ঐশ্বর্যা
সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর ‘দেবদাস’ বলিউডের অন্যতম স্মরণীয় ছবি। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিতে পার্বতী বা পারোর চরিত্রে অভিনয় করেন ঐশ্বর্যা রায় বচ্চন।
তবে এই চরিত্রের জন্য প্রথমে করীনা কপূরের কথা ভাবা হয়েছিল। পরবর্তীতে সৃজনশীল মতপার্থক্যের কারণে করীনার পরিবর্তে ঐশ্বর্যাকে নেওয়া হয় বলে জানা যায়।
শেষ পর্যন্ত ‘দেবদাস’-এর পারো চরিত্রটি ঐশ্বর্যার ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় চরিত্রে পরিণত হয়।

১৫. বদলে যাওয়া নায়িকারাই কখনও হয়ে উঠেছেন ছবির প্রাণ
বলিউডে অভিনেত্রী বদলের ঘটনা নতুন নয়। কখনও ব্যক্তিগত কারণ, কখনও শুটিংয়ের সময়সূচি, কখনও শারীরিক অসুস্থতা, আবার কখনও নির্মাতাদের সঙ্গে পারিশ্রমিক বা সৃজনশীল মতপার্থক্যের কারণে এমন পরিবর্তন ঘটে।
তবে এসব পরিবর্তনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো—যে অভিনেত্রী শেষ পর্যন্ত ছবিতে অভিনয় করেছেন, তাঁদের অনেকেই সেই চরিত্রকে এমনভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন যে চরিত্রটি দর্শকের কাছে তাঁদের সঙ্গেই চিরস্থায়ী হয়ে গেছে।
ঐশ্বর্যার জায়গায় রানি, করীনার জায়গায় অমীষা বা দীপিকা, শ্রদ্ধার জায়গায় পরিণীতি—এমন বহু পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত বলিউডের স্মরণীয় জুটি ও চরিত্রের জন্ম দিয়েছে।
শেষ কথা
সিনেমা নির্মাণ একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। চূড়ান্ত পর্দায় একজন অভিনেত্রীকে দেখা গেলেও তার পেছনে থাকতে পারে একাধিক পরিবর্তনের গল্প। আর সেই কারণেই বলিউডের এই ‘বদলে যাওয়া নায়িকা’র গল্পগুলো আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে কৌতূহলের বিষয়।

“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119