সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলার পাশাপাশি সেনাসদস্যদের কল্যাণ, চিকিৎসা, আবাসন ও অবসর-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তায় গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার
ঢাকা২৪নিউজ ডেস্ক
সেনাসদস্যদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং অবসর-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন’ (এক পদমর্যাদায় সমান পেনশন) বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনীকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ, পেশাদার ও আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সেনাসদস্যদের কল্যাণ ও পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সকালে ঢাকার সাভার সেনানিবাসে কয়েকটি ব্যাটালিয়ন ও রেজিমেন্টকে জাতীয় পতাকা বা ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থ, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা রক্ষা হবে আগামীর বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। বাংলাদেশ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে চায়।
সেনাসদস্যদের কল্যাণে সরকারের উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সেনাসদস্যদের কল্যাণ, আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন এবং অবসর-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তাঁদের জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, জাতীয় পে-স্কেলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেতন ও ভাতা ১০০ শতাংশ থেকে ১৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, দায়িত্ব পালনরত সেনাসদস্যদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরাও যেন যথাযথ সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক নিরাপত্তা পান। সেনাসদস্যদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাঁদের পরিবার ও ভবিষ্যৎ কল্যাণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে বক্তব্যে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি শৃঙ্খলা, দক্ষতা ও নেতৃত্বে
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি আধুনিক বাহিনীর শক্তি শুধু অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম কিংবা জনবলের ওপর নির্ভর করে না। এর প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে শৃঙ্খলা, দক্ষতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা, প্রশিক্ষণ এবং জনগণের আস্থার মধ্যে। সর্বোপরি, চেইন অব কমান্ড বা আদেশের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীর সব পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সৈনিককে সংবিধান, প্রচলিত আইন, সামরিক বিধিবিধান এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অবিচল থাকতে হবে। দেশের জনগণ সশস্ত্র বাহিনীর কাছ থেকে পেশাদারত্ব, দায়িত্বশীলতা ও শৃঙ্খলার প্রত্যাশা করে। প্রধানমন্ত্রীর মতে, সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের দায়িত্বশীল আচরণ ও পেশাগত দক্ষতা বাহিনীর মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরিবর্তিত হচ্ছে যুদ্ধের ধরন, বাড়ছে প্রযুক্তির গুরুত্ব
বর্তমান বিশ্বের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সময়ের সঙ্গে যুদ্ধের ধরন ও কৌশলেও পরিবর্তন আসছে। স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথের প্রচলিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি সাইবার স্পেস, মহাকাশ, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং তথ্যভিত্তিক সক্ষমতা জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতায় সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রশিক্ষণব্যবস্থা উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার সশস্ত্র বাহিনীকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ, পেশাদার ও সর্বাধুনিক হিসেবে গড়ে তোলার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আধুনিক জ্ঞান, উন্নত প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
দুর্যোগ মোকাবিলা ও আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
সশস্ত্র বাহিনীর বহুমুখী ভূমিকার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি দুর্যোগ ও জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতেও সশস্ত্র বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্যোগে উদ্ধারকাজ ও সহায়তা কার্যক্রমে তাঁদের অবদান রয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনেও বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
তিনি বলেন, দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সদস্যদের কল্যাণ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
সেনাবাহিনীর ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স্মরণ
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, একজন সেনা পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি সেনা পরিবেশেই বেড়ে উঠেছেন। তাই ভিন্ন পরিচয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেও এ ধরনের পরিবেশ তাঁর কাছে নতুন নয়। জাতীয় পতাকা বা ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড অর্জনকারী ইউনিটগুলোকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, একটি সামরিক ইউনিটের জন্য এই পতাকা শুধু আনুষ্ঠানিক প্রতীক নয়; এটি ইউনিটের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ, পেশাদারত্ব ও দেশের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতীক।
অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট, ৭ ও ৩২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ২৫ এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্ট, নবম ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন এবং ৫৬ ও ৫৭ ইস্ট বেঙ্গল ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড অর্জনের গৌরব লাভ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় পতাকার গৌরবময় উড্ডয়ন দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগকারী মানুষের অবদান স্মরণ করিয়ে দেয়। জাতীয় পতাকা অর্জনের মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর ওপর অর্পিত দায়িত্ব আরও নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের অঙ্গীকারও জোরালো হয়। তিনি বলেন, পতাকার মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক সৈনিকের পবিত্র দায়িত্ব।
মুক্তিযুদ্ধ ও সেনাবাহিনীর জন্মের ইতিহাস অবিচ্ছেদ্য
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর জন্মের ইতিহাস স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত হামলার পর চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন উপঅধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমানের বিদ্রোহ ঘোষণার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্রোহ ঘোষণার পর মেজর জিয়াউর রহমান অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ফিরে বাংলাভাষী কর্মকর্তা ও সৈনিকদের সংগঠিত করেন এবং সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা বিভিন্ন নিবন্ধে বিবরণ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
- আরও পড়ুন
- সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, রিয়াদের কাছে ব্যাখ্যা চাইল ঢাকা

- বহু লোভ দেখানো হলেও আপস করিনি, জুলাই সনদের রায় আদায় করব: জামায়াত আমির

- সরাইলে মাহফিল থেকে ১৪ বছরের কিশোরীকে তুলে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, আটক ১

- তারুণ্যের স্বপ্নপূরণে এগিয়ে চলছে এবিজি স্পোর্টস সিটি

- সেনাসদস্যদের ‘ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন: প্রধানমন্ত্রী

- শুধু বই পড়ালেই প্রকৃত শিক্ষক হওয়া যায় না: জেলা প্রশাসক

তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে ‘একটি জাতির জন্ম’ শীর্ষক নিবন্ধের উল্লেখ করে বলেন, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিটে সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি সেখানে বর্ণিত হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিবন্ধটি ১৯৭২ সালে দৈনিক বাংলা, ১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রা এবং ১৯৮০ সালে দৈনিক দেশ পত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাংলাভাষী সেনাসদস্যরা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে সেনাসদস্যদের ভূমিকা দেশের সামরিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধে একজন সেনা কর্মকর্তার ঐতিহাসিক ভূমিকা সেনাবাহিনীর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। এ কারণেই দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষ সশস্ত্র বাহিনীর সাফল্যকে বাংলাদেশের সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করে।
জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকার
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা রক্ষা আগামীর বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার। বাংলাদেশ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা জোরদার করতে চায়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা পেশাগত দক্ষতা, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অবদান রাখবেন।
অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য নবম পদাতিক ডিভিশনের সংশ্লিষ্ট সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী। সাভার সেনানিবাসে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও উপদেষ্টা, সেনাবাহিনী প্রধান, কূটনৈতিক কোরের প্রতিনিধিসহ সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119