শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধা অর্জন করতে হলে জ্ঞান, যোগ্যতা ও আচরণের মাধ্যমে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা
স্টাফ রিপোর্টার
শুধু পাঠ্যবই পড়ানো কিংবা শিক্ষার্থীদের পড়া নেওয়ার মধ্যেই একজন শিক্ষকের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত শিক্ষক হতে হলে শিক্ষার্থীদের কাছে জ্ঞান, মেধা, যোগ্যতা ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে নিজেকে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। পদমর্যাদা কিংবা ভয় দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধা অর্জন করা সম্ভব নয়; বরং নিজের কর্ম, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে তাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে হবে। এমন মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
গতকাল চট্টগ্রামে নবনিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য, শিক্ষকদের দায়িত্ব ও মর্যাদা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা এবং মানবিক প্রজন্ম গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বই পড়ানোর বাইরেও শিক্ষকের দায়িত্ব রয়েছে
জেলা প্রশাসক বলেন, বর্তমান সময়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সহজেই বিভিন্ন বই ও শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। ফলে শুধু পাঠ্যবই পড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পড়া আদায় করাই একজন শিক্ষকের সার্থকতার মাপকাঠি হতে পারে না। তিনি বলেন, “বই তো এখন ইন্টারনেটেও পড়া যায়। আপনি শুধু যদি বই পড়ান আর বইয়ের পড়া নেন, তাহলে প্রকৃত শিক্ষক হিসেবে আপনি সার্থক হলেন কি না, সেটি বলা যায় না।”
তাঁর মতে, একজন প্রকৃত শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেন না; পাশাপাশি তাঁদের চিন্তাশক্তি, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশেও ভূমিকা রাখেন। শিক্ষার্থীরা যখন শিক্ষকের জ্ঞান, মেধা, যোগ্যতা ও আচরণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণ করতে আগ্রহী হবে, তখনই সেই শিক্ষকের শিক্ষকতা সার্থকতা লাভ করবে।
ডিগ্রি অর্জনই শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য নয়
শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা কিংবা উচ্চশিক্ষার সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলে উল্লেখ করেন মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তাঁর মতে, শিক্ষার প্রকৃত সুফল তখনই পাওয়া সম্ভব, যখন শিক্ষার্থীরা অর্জিত জ্ঞানের পাশাপাশি দেশপ্রেম, সামাজিক দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা এবং দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবে।
তাই শিক্ষকদের পাঠ্যসূচি শেষ করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম, মানবিকতা, সততা ও সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তাঁরা ভবিষ্যতে নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দেশের উন্নয়ন ও সমাজের কল্যাণেও অবদান রাখতে পারেন।
শিক্ষকদের নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে
শিক্ষকদের মর্যাদা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে জেলা প্রশাসক ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অনেক শিক্ষকের চলে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন। তিনি এ ঘটনাকে দুঃখজনক বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, শিক্ষকদের নিজেদের যোগ্যতা, ব্যক্তিত্ব, পেশাগত দক্ষতা ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আস্থা ও সম্মান অর্জন করতে হবে।
শিক্ষকতার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে হলে পেশাগত সততা বজায় রাখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠাও জরুরি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব ও আচরণ শিক্ষার্থীদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাই শিক্ষকদের এমনভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা তাঁদের কাছ থেকে শুধু পাঠ্যজ্ঞানই নয়, বরং সততা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার শিক্ষাও গ্রহণ করতে পারে।
প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াতে হবে
বর্তমান প্রজন্ম প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, পাঠদান পদ্ধতি ও জ্ঞানচর্চার সুযোগ সম্পর্কে জানতে পারছে। এ বাস্তবতায় শিক্ষকদেরও নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়মিত হালনাগাদ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন জেলা প্রশাসক।
তিনি বলেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাদানের পদ্ধতি ও শিক্ষার্থীদের শেখার ধরনেও পরিবর্তন আসছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষকদের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
এ কারণে শিক্ষকদের নিয়মিত জ্ঞানচর্চা, নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা অর্জন এবং আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত থাকার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন ও সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে পাঠদানকে আরও কার্যকর, আকর্ষণীয় ও সময়োপযোগী করে তোলার চেষ্টা করতে হবে।
নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মেধাকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি
নবনিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জেলা প্রশাসক দাবি করেন, শতভাগ স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তিতে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনসংক্রান্ত ব্যস্ততার মধ্যেও নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দেখানো হয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, শিক্ষকদের পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে লটারির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিয়োগ ও পদায়নপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলেও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
নবনিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি আশা প্রকাশ করেন, তাঁরা সততা, নিষ্ঠা ও পেশাগত দায়িত্ববোধের সঙ্গে নিজ নিজ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করবেন এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।
- আরও প
- ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচ, নতুন সম্ভাবনার পথে আনভীর ক্রিকেট স্টেডিয়াম

- সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, রিয়াদের কাছে ব্যাখ্যা চাইল ঢাকা

- বহু লোভ দেখানো হলেও আপস করিনি, জুলাই সনদের রায় আদায় করব: জামায়াত আমির

- সরাইলে মাহফিল থেকে ১৪ বছরের কিশোরীকে তুলে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, আটক ১

- তারুণ্যের স্বপ্নপূরণে এগিয়ে চলছে এবিজি স্পোর্টস সিটি

সীমাবদ্ধতাকে দায়িত্ব পালনের বাধা করা যাবে না
কর্মস্থলের পরিবেশ, সুযোগ-সুবিধা কিংবা অন্যান্য সীমাবদ্ধতাকে দায়িত্ব পালনের অন্তরায় হিসেবে না দেখার আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকেরই নিজের দায়িত্ব ও অবদান সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “আমি দেশকে কতটুকু দিলাম, কী অবদান রাখলাম, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে যে সেবা গ্রহণ করছি, তার বিপরীতে রাষ্ট্রকে কী দিলাম—এই প্রশ্ন নিজেকে করতে হবে।”
মানবিক ও নিরাপদ রাষ্ট্র গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
মানবিক, দায়িত্বশীল ও নিরাপদ রাষ্ট্র গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, কাউকে শুধু নির্দেশনা দিয়ে মানবিক করে তোলা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে নিজেদের আচরণ, মূল্যবোধ ও কর্মের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামনে বাস্তব উদাহরণ তৈরি করতে হবে।
শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কথা শোনার পাশাপাশি তাঁদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে। তাই শিক্ষকদের মধ্যে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের চর্চা থাকা জরুরি। এসব গুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জেলা প্রশাসক আশা প্রকাশ করেন, নবনিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন। তাঁরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানচর্চার আগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি নৈতিকতা, দেশপ্রেম, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে ভূমিকা রাখবেন। এর মধ্য দিয়েই একটি দক্ষ, সচেতন ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সার্বিকভাবে জেলা প্রশাসকের বক্তব্যে উঠে এসেছে, শিক্ষকতা কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণের পেশা নয়; এটি শিক্ষার্থীদের জীবন গঠন, মূল্যবোধ বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাই প্রকৃত শিক্ষক হতে হলে জ্ঞানের পাশাপাশি আচরণ, যোগ্যতা ও মানবিক গুণাবলির মাধ্যমেও শিক্ষার্থীদের কাছে অনুসরণীয় হয়ে উঠতে হবে।

“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119