নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের সড়কগুলোতে মৃত্যুর মিছিল থামাতে দক্ষ চালক তৈরির বিকল্প নেই। অথচ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর দীর্ঘসূত্রতায় গত সাত বছর ধরে ঝুলে আছে ৩ লাখ ভারী যানবাহনের চালক তৈরির একটি মেগা প্রকল্প। সরকারের উদাসীনতায় একদিকে যেমন দক্ষ চালক তৈরি হচ্ছে না, অন্যদিকে অকার্যকর হয়ে পড়ে আছেন কয়েক হাজার নিবন্ধিত প্রশিক্ষক।
১. প্রকল্পের পটভূমি ও লক্ষ্য
সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ‘ভারী যানবাহনের চালক তৈরির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ প্রদান’ শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছিল।
- লক্ষ্য: ৫ বছরে ৩ লাখ দক্ষ ভারী যানবাহনের চালক তৈরি (প্রতি বছর ৬০ হাজার)।
- সময়কাল: প্রাথমিকভাবে অক্টোবর ২০১৯ থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত।
- বাজেট: প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৭৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
২. কেন ঝুলে আছে এই উদ্যোগ?
২০১৯ সালে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠানোর পর থেকেই প্রকল্পটি ফাইলবন্দি হয়ে আছে।
- করোনা মহামারি: ২০২০ সালে অতিমারির কারণে প্রকল্পটির অনুমোদন স্থগিত হয়ে যায়।
- সংশোধন ও কাটছাঁট: বারবার প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। ২০২৪ সালে ব্যয় কমিয়ে পুনরায় চেষ্টা করা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
- আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: বিআরটিএ এবং বিআরটিসি সংশ্লিষ্টদের মতে, আমলাতান্ত্রিক ফাইল চালাচালিতেই গুরুত্বপূর্ণ এই জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটি থমকে আছে।
৩. প্রশিক্ষণের রূপরেখা ও প্রস্তুতি
প্রকল্পটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো হয়েছিল, যেখানে সারা দেশের বিভিন্ন সংস্থাকে যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল:
- প্রশিক্ষণ কেন্দ্র: বিআরটিসির ২৪টি, সশস্ত্র বাহিনীর (AFD) ২৪টি, আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির ২৬টি, পুলিশের ১টি এবং ১৯টি আউটসোর্সিং কেন্দ্রসহ মোট ৯৪টি কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ছিল।
- প্রশিক্ষণের ধরন: * অভিজ্ঞ হালকা/মাঝারি চালকদের জন্য ২ সপ্তাহের উচ্চতর প্রশিক্ষণ।
- অনভিজ্ঞদের জন্য ৪ সপ্তাহের নিবিড় প্রশিক্ষণ।
- ভাতা: চালকদের উৎসাহিত করতে দৈনিক ১০০০ টাকা খোরাকি ও ৩০০ টাকা খাবার ভাতার প্রস্তাব করা হয়েছিল।
৪. অলস বসে আছেন ১,৬৫০ প্রশিক্ষক
বিআরটিএ বর্তমানে ১,৬৫০ জন অনুমোদিত প্রশিক্ষক তৈরি করে রেখেছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালেই একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ১,৪২০ জনকে দক্ষ করে তোলা হয়। কিন্তু মূল প্রকল্পটি অনুমোদিত না হওয়ায় এই বিশাল জনবল কোনো কাজেই আসছে না। সরকারি উদ্যোগে চালিত ড্রাইভিং সেন্টারগুলোও এখন ঝিমিয়ে পড়ছে।
৫. সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিত্র ও বিশেষজ্ঞ মত
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গত ১৭ থেকে ২৬ মার্চের মধ্যেই দেশে ৩৪২টি দুর্ঘটনায় ২৭৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
- প্রধান কারণ: দক্ষ চালকের অভাব এবং বেপরোয়া গতি (বুয়েটের তথ্যমতে ৯০% দুর্ঘটনার কারণ অতিগতি)।
- বিশেষজ্ঞদের দাবি: প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক না করলে এবং দক্ষ চালক তৈরি না করলে শুধু আইন দিয়ে সড়ক নিরাপদ করা সম্ভব নয়।
৬. বর্তমান বিকল্প উদ্যোগ (আশার আলো)
বিআরটিসির জেনারেল ম্যানেজার ফাতেমা বেগমের দেওয়া তথ্যমতে, মূল প্রকল্পটি ঝুলে থাকলেও ছোট পরিসরে কিছু কাজ চলছে:
- এসআইসিআইপি প্রোগ্রাম: ২০২৮ সাল পর্যন্ত ৮ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
- বিশ্বব্যাংকের সহায়তা: আগামী মে মাস থেকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৬০ হাজার চালক তৈরির একটি নতুন কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে বিআরটিসির ৪টি ইনস্টিটিউটসহ মোট ২৭টি কেন্দ্রে কার্যক্রম চলমান।
উপসংহার: সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দক্ষ চালক তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। ৯৭৭ কোটি টাকার প্রকল্পটি দীর্ঘ ৭ বছর ঝুলে থাকা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, বরং জননিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। দেশের ১,৬৫০ জন প্রশিক্ষককে কাজে লাগিয়ে দ্রুত এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে সড়কের বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
7v8ah5