নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বৈশাখের প্রচণ্ড গরম, দীর্ঘ অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত তেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন সাধারণ মানুষ। কোথাও সকাল থেকে সন্ধ্যা, কোথাও আবার সারারাত অপেক্ষা করেও মিলছে না পেট্রোল বা অকটেন। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেল চালক, প্রাইভেটকার ব্যবহারকারী, রাইড শেয়ারিং চালকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। রাজধানীর বাড্ডা এলাকার ‘মক্কা’ ফিলিং স্টেশনে দেখা যায় এমনই হৃদয়বিদারক চিত্র। সেখানে জাহিদুর রহমান নামে এক চাকরিজীবী মোটরসাইকেল চালক সকাল ৮টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল বাইকের জন্য কিছু জ্বালানি সংগ্রহ করা, যাতে সপ্তাহজুড়ে অফিসে যাতায়াত করা যায়। কিন্তু বিকেল ৫টার দিকে এসে জানতে পারেন, পাম্পে তেল শেষ।

প্রায় ৯ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পুরো সময়টাই তিনি মোটরসাইকেলের ওপর বসে কাটিয়েছেন। সেখানেই সেরেছেন সকালের নাশতা ও দুপুরের খাবার। কিন্তু দিনশেষে তেল তো দূরের কথা, ভাগ্যে জুটেছে শুধু হতাশা।
জাহিদুর রহমান বলেন, “আমি চাকরি করি, যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেলই আমার প্রধান ভরসা। গত কয়েকদিন ধরে তেলের জন্য চরম ভোগান্তিতে আছি। আজ ছুটির দিন হওয়ায় সকালেই লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু যখন পাম্পের একদম কাছে পৌঁছালাম, তখনই জানানো হলো পেট্রোল-অকটেন শেষ।” তিনি আরও বলেন, “সারাদিন শুধু মনে হচ্ছিল, তেলের পাম্পের নজেল আর কত দূর! যেন এক অন্তহীন অপেক্ষা।” শুধু বাড্ডা নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পাম্পেও একই চিত্র দেখা গেছে। মৎস্য ভবন এলাকার রমনা ফিলিং স্টেশনে কথা হয় রাইড শেয়ারিং চালক আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে। তিনি গত রাত ৯টা থেকে লাইনে অপেক্ষা করছিলেন।
আব্দুর রাজ্জাক বলেন: “রাইড শেয়ারিং করেই সংসার চলে। তেল না পেলে মোটরসাইকেল চলবে না, চুলাও জ্বলবে না। তাই ঘুম- বিশ্রাম বাদ দিয়ে সারারাত বাইকের ওপর বসে আছি।”জ্বালানি সংকটে শুধু গ্রাহকরাই নয়, বিপাকে পড়েছেন পাম্প মালিকরাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাড্ডার এক ফিলিং স্টেশন মালিক জানান, ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ না পাওয়ায় তারা চরম চাপে আছেন। তিনি বলেন, “আগে যেখানে কয়েক হাজার লিটার তেল পেতাম, এখন তার অর্ধেক পাচ্ছি। অন্যদিকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল না পেয়ে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা আমাদের ওপর রাগ ঝাড়ছেন।”
উত্তর বাড্ডার আরেকটি পাম্পে প্রাইভেটকারের লাইন গিয়ে ঠেকেছে নতুন বাজার পর্যন্ত। সেখানে অপেক্ষমাণ চালক হামিদুর রহমান বলেন, “সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে সকালে তেল পাই, এরপর শুরু হয় অফিস আর স্কুলে বাচ্চাদের আনা-নেওয়ার কাজ। আমাদের জীবনের ওপর দিয়ে চরম নির্যাতন চলছে।”
আরেক চালক মাসুদ রানা জানান: “১২ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে আয়-রোজগার বন্ধ থাকে। এতে সংসার চালানোই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।” তবে এই সংকটের মধ্যে কিছুটা আশার কথা শুনিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, আগামী রোববার (১৯ এপ্রিল) থেকে বাজারে অকটেন সরবরাহ ২৫ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিপিসির দাবি, দেশে বর্তমানে অকটেনের কোনো ঘাটতি নেই। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের মার্চ মাসে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৯৩ টন অকটেন সরবরাহ করা হলেও চলতি বছরের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২১৯ টনে। তবে এপ্রিল মাসে এসে সরবরাহ কমে গেছে। ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন গড় সরবরাহ ছিল ১ হাজার ১১৫ টন, যা আগের তুলনায় ১০৪ টন কম।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরবরাহ ঘাটতি, অতিরিক্ত চাহিদা এবং বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগীরা।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119