“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

লিটারপ্রতি বেড়েছে ১৫ টাকা

বাস ভাড়া বাড়ানোর দাবি মালিকদের, বাড়তে পারে নিত্যপণ্যের দামও

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিশ্ববাজারে চলমান অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। সরকার ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করায় পরিবহন খাতে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির পরপরই বাস ও ট্রাক মালিকরা ভাড়া পুনর্নির্ধারণের দাবি তুলেছেন। তাদের মতে, শুধু ডিজেলের দাম নয়—গাড়ির যন্ত্রাংশ, টায়ার, রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাংক ঋণের সুদসহ সব খরচই বেড়েছে। ফলে বর্তমান ভাড়ায় পরিবহন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।


ডিজেলের দাম বাড়তেই ভাড়া বৃদ্ধির দাবি

নতুন ঘোষণায় ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী যানবাহন ও গণপরিবহনে। পরিবহন মালিকরা বলছেন, বর্তমান দূরপাল্লার বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটার ২ টাকা ১২ পয়সা, যা বর্তমান ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই তারা নতুন করে প্রতি কিলোমিটার ৪ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত ভাড়া নির্ধারণের প্রস্তাব দিতে চান। একাধিক মালিক জানিয়েছেন, সরকারকে দ্রুত বৈঠকে বসে নতুন ভাড়া কাঠামো ঘোষণা করতে হবে। না হলে অনেক পরিবহন চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।


২০২২ সালেও বাড়ানো হয়েছিল জ্বালানির দাম

বাংলাদেশে সর্বশেষ বড় ধরনের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল ২০২২ সালের ৫ আগস্ট। সে সময় ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৮০ টাকা থেকে ১১৪ টাকা করা হয়েছিল, যা ছিল প্রায় ৪২.৫ শতাংশ বৃদ্ধি। তখন বাস মালিকরা দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটার ২ টাকা ৮০ পয়সা ভাড়া চাইলেও সরকার নির্ধারণ করেছিল ২ টাকা ২০ পয়সা। পরে ২০২৫ সালের জুনে তা কমিয়ে ২ টাকা ১২ পয়সা করা হয়। এবার নতুন করে ডিজেলের দাম বাড়ায় আবারও ভাড়া বৃদ্ধির দাবি জোরালো হয়েছে।


“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

শুধু তেলের দাম নয়, সব খরচ বেড়েছে

বাস মালিকদের অভিযোগ, দেশে শুধু তেলের দাম বাড়লেই ভাড়া বাড়ানো নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু অন্যান্য খরচ বাড়লেও তা বিবেচনায় নেওয়া হয় না।

তাদের হিসাবে—

  • ২০২২ সালে এক জোড়া বাসের টায়ারের দাম ছিল ৫০ হাজার টাকা, এখন তা ৭৪-৮০ হাজার টাকা
  • ১০ টাকার যন্ত্রাংশ এখন কিনতে হচ্ছে ২০-২৩ টাকায়
  • ১২০০ টাকার পার্টস এখন ২৫০০-৩০০০ টাকা
  • ইঞ্জিন ওয়েল, গিয়ার ওয়েল, ব্যাটারি ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের দামও বেড়েছে কয়েকগুণ

একজন বাস মালিক বলেন, “মাস শেষে গাড়ির আয় দিয়ে খরচই ওঠে না। ভাড়া না বাড়ালে গাড়ি চালানো অসম্ভব হয়ে যাবে।”


বাস কেনার খরচও বেড়েছে ব্যাপকভাবে

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, ২০২২ সালে একটি বাসের চেসিস কিনতে লাগত প্রায় ২৪ লাখ টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৩৬ লাখ টাকা। একইভাবে বাসের বডি তৈরির খরচ ১১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, শুধু একটি বাস তৈরি করতেই এখন অতিরিক্ত ২০-২১ লাখ টাকা বেশি ব্যয় হচ্ছে। এর সঙ্গে ব্যাংক ঋণের সুদও ৯ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে নতুন বাস কেনা কিংবা পুরোনো বাস চালু রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে।


মালিকদের প্রস্তাব: কিলোমিটারে সাড়ে ৩ টাকা না হলে সম্ভব নয়

পরিবহন নেতারা বলছেন, আগেই তারা সরকারের কাছে ৩ টাকা ৭৫ পয়সা ভাড়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা ছিল ডলারের দাম বৃদ্ধি ও যন্ত্রাংশ আমদানি ব্যয় বিবেচনায়। এখন ডিজেলের নতুন দাম যুক্ত করে তারা ৪ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত প্রস্তাব দিতে চান। তবে এখনো সরকারিভাবে বাস ভাড়া বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।


বিশেষজ্ঞদের মত: বছরে একবার নির্ধারণ হোক ভাড়া

বুয়েটের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান বলেন, সরকার চাইলে প্রতিবছর বাজেটের আগে একটি পূর্ণাঙ্গ কস্টিং করে বাস ভাড়া নির্ধারণ করতে পারে।

তার মতে—

  • বছরে একবার ভাড়া নির্ধারণ করা হলে অস্থিরতা কমবে
  • মাঝপথে বড় পরিবর্তন হলে আলাদাভাবে সমন্বয় করা যাবে
  • মালিক ও যাত্রী—উভয় পক্ষের জন্য স্বচ্ছতা থাকবে

তিনি বলেন, “এভাবে হঠাৎ হঠাৎ ভাড়া বাড়ানো বা কমানোর সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া দরকার।”


বিরোধী দলের প্রতিবাদ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম বাড়ানো দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

তার ভাষায়—

  • পরিবহন ব্যয় বাড়বে
  • খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে
  • মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে
  • শিল্প ও কৃষি খাতে ব্যয় বাড়বে
  • মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হবে

তিনি এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।


ক্যাবের আশঙ্কা: সব পণ্যের দাম বাড়বে

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, হঠাৎ করে জ্বালানির দাম বাড়ানোর ফলে ব্যবসায়ীরা সব পণ্যের দাম বাড়ানোর অজুহাত পেয়ে গেছে।

তার মতে—

  • নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে
  • পরিবহন খরচ বাড়বে
  • বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হবে

সাধারণ মানুষের উদ্বেগ

নতুন জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির খবরে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কারণ অতীতে দেখা গেছে, জ্বালানির দাম বাড়লেই—

  • বাস ভাড়া বাড়ে
  • ট্রাক ভাড়া বাড়ে
  • সবজির দাম বাড়ে
  • মাছ-মাংসের দাম বাড়ে
  • নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ে

ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যায়।


এখন নজর সরকারের সিদ্ধান্তে

পরিবহন মালিকরা দ্রুত ভাড়া বৃদ্ধির দাবি তুললেও সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। তবে জ্বালানির নতুন দামের প্রভাব আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই বাজার, পরিবহন ও নিত্যপণ্যে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *