নকল, ডিজিটাল জালিয়াতি ও পরীক্ষা বিশৃঙ্খলায় উদ্বেগ; ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা উপাচার্যের
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের সর্ববৃহৎ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-এর পরীক্ষাগুলোতে নকল, ডিজিটাল জালিয়াতি ও শৃঙ্খলাভঙ্গ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত দেড় বছরে (সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬) অনুষ্ঠিত ১৮টি পরীক্ষায় নকল ও অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে রেকর্ডসংখ্যক দুই হাজার ৫৭১ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার ও শাস্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা শৃঙ্খলা কমিটি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দপ্তর ও শৃঙ্খলা কমিটির নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বহিষ্কৃতদের বড় অংশই অনার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থী। বিশেষ করে চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষাগুলোতে নকলের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর জালিয়াতি, দুর্বল তদারকি, সেশনজটের চাপ এবং সনদনির্ভর চাকরির প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
অনার্স পরীক্ষায় সর্বাধিক বহিষ্কার
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অনার্স পর্যায়ের পরীক্ষাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী শাস্তির আওতায় এসেছে।
- ‘অনার্স ৩য় বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় বহিষ্কার হয়েছেন ৩৩৭ জন
- ‘অনার্স ৪র্থ বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় ৩১৮ জন
- ‘অনার্স ৪র্থ বর্ষ-২০২২’ পরীক্ষায় ৩০৪ জন
- ‘অনার্স ২য় বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় ১৯০ জন
- ‘অনার্স ১ম বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় ১১৯ জন
এছাড়া সদ্য শুরু হওয়া ‘অনার্স ১ম বর্ষ-২০২৪’ পরীক্ষাতেও ইতোমধ্যে ৮৪ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছেন।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনার্সের মাত্র ছয়টি পরীক্ষাতেই মোট এক হাজার ২৭২ জন শিক্ষার্থী সাজা পেয়েছেন, যা মোট বহিষ্কারের প্রায় ৪৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শাস্তির প্রায় অর্ধেকই গেছে অনার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ওপর।
ডিগ্রি, মাস্টার্স ও এলএলবিতেও উদ্বেগজনক চিত্র
ডিগ্রি পাস কোর্সের ছয়টি পরীক্ষায় মোট ৫৩১ জন শিক্ষার্থী শাস্তির মুখে পড়েছেন। এর মধ্যে—
- ‘ডিগ্রি পাস ৩য় বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় ১২৩ জন
- ‘ডিগ্রি পাস ৩য় বর্ষ-২০২২’ পরীক্ষায় ৮২ জন
- ‘ডিগ্রি পাস ২য় বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় ৯৩ জন
- ‘ডিগ্রি পাস ২য় বর্ষ-২০২২’ পরীক্ষায় ৮২ জন
- ‘ডিগ্রি পাস ১ম বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় ৯০ জন
- ‘ডিগ্রি পাস ১ম বর্ষ-২০২২’ পরীক্ষায় ৭৩ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছেন।
অন্যদিকে মাস্টার্স ও প্রিলিমিনারি পর্যায়েও নকলের প্রবণতা কম নয়।
- ‘মাস্টার্স শেষ পর্ব-২০২২’ পরীক্ষায় ১২৭ জন
- ‘মাস্টার্স শেষ পর্ব-২০২১’ পরীক্ষায় ১২৪ জন
- ‘প্রিলিমিনারি টু মাস্টার্স-২০২২’ পরীক্ষায় ৮৩ জন
- ‘প্রিলিমিনারি টু মাস্টার্স-২০২১’ পরীক্ষায় ৫৭ জন শিক্ষার্থী সাজা পেয়েছেন।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য এসেছে আইন বিভাগে। পেশাজীবী কোর্স হিসেবে পরিচিত এলএলবি পরীক্ষায়ও বড় ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে।
- ‘এলএলবি শেষ পর্ব-২০২২’ পরীক্ষায় একযোগে ২৩৪ জন
- ‘এলএলবি ১ম পর্ব-২০২৩’ পরীক্ষায় ৫১ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছেন।
চূড়ান্ত বর্ষেই সবচেয়ে বেশি জালিয়াতি
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, অনার্স ৩য় ও ৪র্থ বর্ষের পরীক্ষাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি নকল ও জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে।
অনার্স ৩য় ও ৪র্থ বর্ষের তিনটি পরীক্ষায় মোট ৯৫৯ জন শিক্ষার্থী সাজা পেয়েছেন, যা অনার্স পর্যায়ের মোট শাস্তির ৭৫ শতাংশেরও বেশি।
শিক্ষকদের মতে, চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থীরা চাকরির বাজারে দ্রুত প্রবেশের চাপ, প্রস্তুতির ঘাটতি এবং সেশনজটের কারণে বেশি ঝুঁকি নিচ্ছেন।
১৯ ধরনের অপরাধে ৬ স্তরের শাস্তি
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা শৃঙ্খলা বিধিমালায় ১৯ ধরনের অপরাধের বিপরীতে ছয় স্তরের শাস্তির বিধান রয়েছে।
সাধারণ কথা বলা, ধূমপান, মোবাইল বহন বা অননুমোদিত কাগজপত্র রাখার মতো অপরাধে সংশ্লিষ্ট বছরের পরীক্ষা বাতিল করা হয়।
মোবাইল ফোন বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে নকল করলে সংশ্লিষ্ট বছরের পরীক্ষা বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী এক বছর সব ধরনের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়।
উত্তরপত্র বিনিময়, রোল নম্বর পরিবর্তন বা ভুয়া তথ্য দিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে দুই বছরের বহিষ্কারাদেশ দেওয়া হয়।
ভুয়া পরিচয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ, উত্তরপত্র বাইরে নিয়ে গিয়ে পুনরায় জমা দেওয়া কিংবা জালিয়াতির গুরুতর ঘটনায় তিন বছরের বহিষ্কারাদেশ দেওয়া হয়।
সবচেয়ে কঠোর শাস্তি রাখা হয়েছে উত্তরপত্র ছিঁড়ে ফেলা, শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করা, হল ত্যাগ করে উত্তরপত্র জমা না দেওয়া কিংবা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য। এমন ঘটনায় চার বছর পর্যন্ত বহিষ্কার কিংবা স্থায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
ডিজিটাল নকল নিয়ে আতঙ্কিত শিক্ষকরা
পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে এখন শুধু চিরকুট নয়, বাড়ছে প্রযুক্তিনির্ভর জালিয়াতিও। বিভিন্ন কলেজের কক্ষ পরিদর্শকরা জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীরা এখন ক্ষুদ্রাকৃতির ডিজিটাল ডিভাইস, স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট ব্যবহার করে পরীক্ষার হলে উত্তর সংগ্রহের চেষ্টা করছে।
বিশেষ করে ইংরেজি, গণিত ও অ্যাকাউন্টিংয়ের মতো বিষয়গুলোতে এই প্রবণতা বেশি। অনেক সময় এত সূক্ষ্মভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে যে সাধারণ নজরদারিতে তা ধরা কঠিন হয়ে পড়ছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের অনেক কেন্দ্রে প্রবেশপথে যথাযথ তল্লাশি হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা সহজেই নিষিদ্ধ ডিভাইস নিয়ে হলে প্রবেশ করছে। অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শকদের শিথিল মনোভাবও অনিয়ম বাড়াচ্ছে।
‘শুধু শাস্তি নয়, দরকার শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন’
উত্তরবঙ্গের একটি কলেজের এক সহযোগী অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনেক শিক্ষার্থী সারা বছর ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে এবং পরীক্ষার আগে গাইড বইনির্ভর প্রস্তুতি নেয়। ফলে পরীক্ষায় গিয়ে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে তারা নকলের আশ্রয় নেয়।
ময়মনসিংহের এক অধ্যাপক বলেন, “অনার্সের শেষ বর্ষের একজন শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হলে তার জীবন থেকে ১-২ বছর হারিয়ে যায়। তারপরও তারা কেন এই ঝুঁকি নিচ্ছে, তা নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, “শুধু শাস্তি দিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা, নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি এবং মানসম্মত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।”
উপাচার্যের ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ এস এম আমানুল্লাহ পরীক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।
সম্প্রতি ময়মনসিংহে আঞ্চলিক কার্যালয় উদ্বোধন শেষে বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। এ সময় তাৎক্ষণিকভাবে ১০ জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন,
“পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। পরীক্ষা সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে তা প্রহসনে পরিণত হয়।”
তিনি আরও বলেন,
“শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, খাতা মূল্যায়নে গাফিলতি করলেও শিক্ষকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।”
উপাচার্য জানান, পুনর্মূল্যায়নের পর প্রায় ৮-৯ হাজার শিক্ষার্থী পাস করছে, যা খাতা মূল্যায়নের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। এ কারণে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সেশনজট কমানোর দাবি প্রশাসনের
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, গত এক বছরে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় গতি এসেছে।
উপাচার্যের ভাষ্য অনুযায়ী—
- ২০২৫ সালে প্রায় ৩০০টি পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে
- অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ
- আগে যেখানে ফল প্রকাশে ৫-৬ মাস লাগত, এখন ৪৫ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশ করা হচ্ছে
- ইতোমধ্যে ৪০ শতাংশ সেশনজট কমেছে
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী বছরের মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় সেশনজটমুক্ত অবস্থায় পৌঁছাবে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মত
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগুলোতে নকলের এই বিস্তার দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত।
তাদের মতে, শুধু বহিষ্কার নয়—
- নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত করা
- ডিজিটাল নজরদারি বাড়ানো
- পরীক্ষাকেন্দ্রে কড়াকড়ি তল্লাশি
- শিক্ষকদের জবাবদিহিতা
- শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা বৃদ্ধি
এসব উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন না করলে নকলের এই সংস্কৃতি বন্ধ করা কঠিন হবে।
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ”
01612346119