“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119

ইইউর বাজারে পোশাক রপ্তানিতে বড় ধাক্কা, পিছিয়ে বাংলাদেশ

আট মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ১১.৬৭ শতাংশ; চীন ও ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধির বিপরীতে উৎপাদন ব্যয় ও পণ্যের দাম কমে যাওয়ায় চাপে দেশের পোশাকশিল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ইইউর বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অর্থমূল্যে এই হ্রাস প্রায় ১৫৭ কোটি ইউরো।

ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ১৯৩ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৫০ কোটি ইউরো।

রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ও গড় মূল্য কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগী চীন ও ভিয়েতনাম একই সময়ে ইইউর বাজারে রপ্তানি আয় বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। ফলে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ এই বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

রপ্তানি আয় কমার পেছনে পরিমাণ ও দামের প্রভাব

ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। তবে রপ্তানি আয় কমার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য হ্রাস।

গত বছরের একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য ছিল ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো। চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরোতে। অর্থাৎ, প্রতি কেজি পোশাক রপ্তানিতে গড় মূল্য কমেছে ১ দশমিক ১১ ইউরো। এতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ একদিকে আগের তুলনায় কম পরিমাণে পোশাক রপ্তানি করছে, অন্যদিকে রপ্তানি করা পোশাকের গড় মূল্যও কম পাচ্ছে। এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে মোট রপ্তানি আয় কমে গেছে।

“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” 01612346119
“বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ” ✉ Email: dhaka24news.top@gmail.com

আগস্টে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা

জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সামগ্রিক হিসাব নেতিবাচক হলেও শুধু আগস্ট মাসের পরিসংখ্যানে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। গত বছরের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে ইইউর মোট পোশাক আমদানির মূল্য বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭২ শতাংশ। তবে আমদানির পরিমাণ কমেছে শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ। একই সময়ে গড় আমদানিমূল্য বেড়েছে ১ দশমিক ২৯ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, আগস্টে আমদানির পরিমাণ সামান্য কমলেও গড় মূল্য বৃদ্ধির কারণে মোট আমদানি মূল্য বেড়েছে। তবে এটি বাংলাদেশের রপ্তানি পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতির ইঙ্গিত কি না, তা নিশ্চিত হতে পরবর্তী মাসগুলোর তথ্য পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

চীনের সঙ্গে মূল্য প্রতিযোগিতায় চাপে বাংলাদেশ

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার পেছনে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। রপ্তানিকারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির প্রভাবে চীন ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে আরও বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। বাজার ধরে রাখতে দেশটি তুলনামূলক কম দামে পোশাকের কার্যাদেশ নিচ্ছে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের ওপর মূল্য প্রতিযোগিতার চাপ বাড়ছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, চীনের কম দামের সঙ্গে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোকে বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের চাপও সামলাতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এবং উচ্চমূল্যের কারণে দেশের পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। একদিকে কম দামে পণ্য সরবরাহকারী দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি—এই দ্বিমুখী চাপে রপ্তানিকারকদের মুনাফা কমছে। তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।

কমছে পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো রপ্তানি করা পণ্যের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করা। রপ্তানির পরিমাণ বাড়লেও যদি প্রতি ইউনিট পণ্যের দাম কমে যায়, তাহলে মোট আয় ও মুনাফা প্রত্যাশিত হারে বাড়ে না। বর্তমান পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রপ্তানির পরিমাণ ও গড় মূল্য—দুই ক্ষেত্রেই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো পণ্যের গড় বিক্রয়মূল্য কমে যাওয়া।

তার মতে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্যের ন্যায্যমূল্য আদায় করতে না পারলে রপ্তানি বাড়লেও আয় ও মুনাফা প্রত্যাশিত হারে বাড়বে না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কম দামের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে উচ্চমূল্য সংযোজিত ও বৈচিত্র্যময় পোশাক উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়িয়ে পণ্যের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি।

দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ অর্থনীতিবিদের

ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। এই বাজারে রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, ইইউর বাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী প্রবণতা উদ্বেগজনক। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিলম্ব না করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি মনে করেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ জন্য রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণ চিহ্নিত করার পাশাপাশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

চীন ও ভিয়েতনাম এগিয়ে, বাংলাদেশের আয় কমেছে

ইইউর বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে চীন ও ভিয়েতনামের রপ্তানি আয়ের চিত্র তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে চীন থেকে ইইউর পোশাক আমদানি বেড়েছে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এ সময়ে দেশটি থেকে আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৭১ কোটি ইউরো। চীনের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। তবে দেশটির গড় রপ্তানিমূল্য কমেছে ১ দশমিক ০৪ শতাংশ।

অন্যদিকে, ভিয়েতনাম থেকে ইইউর পোশাক আমদানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। দেশটি থেকে আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি ইউরো। তবে ভিয়েতনামের রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। তা সত্ত্বেও গড় রপ্তানিমূল্য ১০ দশমিক ১১ শতাংশ বাড়ায় দেশটির মোট রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এই তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান ভিন্ন। চীন রপ্তানির পরিমাণ বাড়িয়ে আয় বাড়িয়েছে। ভিয়েতনাম রপ্তানির পরিমাণ কমলেও গড় মূল্য বাড়িয়ে মোট আয় বৃদ্ধি করেছে। বিপরীতে বাংলাদেশকে রপ্তানির পরিমাণ ও গড় মূল্য—দুই ক্ষেত্রেই পতনের মুখে পড়তে হয়েছে।

তুরস্ক, ভারত ও পাকিস্তানের রপ্তানিও কমেছে

ইইউর বাজারে শুধু বাংলাদেশ নয়, অন্যান্য পোশাক রপ্তানিকারক দেশের কয়েকটির আয়ও কমেছে। তবে হ্রাসের হার ও রপ্তানির পরিমাণের পরিবর্তনে দেশভেদে পার্থক্য রয়েছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ইইউর বাজারে তুরস্কের পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ০২ শতাংশ। দেশটি থেকে আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৫১০ কোটি ইউরো।

একই সময়ে ভারতের রপ্তানি আয় কমেছে ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ১১ দশমিক ০৩ শতাংশ। পাকিস্তানের রপ্তানি আয় কমেছে ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ, মরক্কোর ৬ দশমিক ১০ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। তবে পাকিস্তানের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বাড়লেও গড় রপ্তানিমূল্য কমেছে ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। কম্বোডিয়ার রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ, কিন্তু গড় রপ্তানিমূল্য বেড়েছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ।

এসব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক পোশাক বাজারে শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; পণ্যের গড় মূল্য, উৎপাদন ব্যয় এবং ক্রেতাদের চাহিদাও রপ্তানি আয়ের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

  • আরও পড়ুন

প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কী করতে হবে

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা এবং পণ্যের গুণগত মান উন্নয়নের পাশাপাশি নতুন কৌশল গ্রহণ জরুরি। বিশেষ করে কম দামের পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বেশি মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনে মনোযোগ দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়ানো, পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আগেই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্যের উপযুক্ত মূল্য ও মুনাফা নিশ্চিত করতে পারলেই আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।

ঢাকার E দোকান

📱 ০ ১ ৬ ১ ২ ৩ ৪ ৬ ১ ১ ৯
```

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *